হাদি হত্যা মামলায় কেউ গ্রেফতার হয়নি দাবিতে অর্ধসত্য তথ্য প্রচার

গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুকে ঘিরে গত ১৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে দেশের দুটি সংবাদমাধ্যম দৈনিক প্রথম আলো ও দ্যা ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা হয়। উক্ত ঘটনা দুটিকে তুলনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি দাবি প্রচারিত হয়েছে যে, পত্রিকা দুটির কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় ৯/১৫/২৮ জনকে গ্রেফতার করলেও হাদি হত্যার ঘটনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাউকে গ্রেফতার করেনি।

উক্ত দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ)৷

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, হাদি হত্যার ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার না করার দাবিটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হাদি হত্যার ঘটনায় অন্তত ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অপরদিকে, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় ৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে প্রচারিত দাবিগুলো পৃথকভাবে যাচাই করেছে রিউমর স্ক্যানার।

হাদি হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারের তথ্য

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম সময় টিভির ওয়েবসাইটে গত ২৩ ডিসেম্বর ‘ওসমান হাদি হত্যা: শুটার ফয়সাল ও স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব ঘিরে রহস্য’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনায় ফয়সাল করিম মাসুদ নামে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতাকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় ফয়সাল করিমের মা–বাবা, স্ত্রী, শ্যালকসহ ১০ জনকে গ্রেফতার করা হয়।’

পরবর্তীতে, বিবিসি বাংলার ওয়েবসাইটে গত ২১ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, হাদি হত্যা মামলায় সেসময় পর্যন্ত ডজনখানেক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা, মা, স্ত্রী এবং শ্যালকও রয়েছে। এছাড়া মাসুদের এক বান্ধবীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে গত ২২ ডিসেম্বর দুপুরে সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কমিটির বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, শরিফ ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ২৪ এর ওয়েবসাইটে গত ২১ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে গ্রেফতারকৃত ০৯ ব্যক্তির নাম পরিচয় পাওয়া যায়। তারা হলেন- ফয়সালের বাবা মো. হুমায়ুন কবির ও মা মোসা. হাসি বেগম, স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা ও শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু, রেন্ট-এ কার ব্যবসায়ী মো. মুফতি নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল, ফয়সালের সহযোগী মো. কবির, সিবিউন দিউ ও সঞ্জয় চিসিম।

অর্থাৎ, এসব প্রতিবেদন থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, হাদি হত্যার ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে এখনো গ্রেফতার করতে না পারলেও এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

উল্লেখ্য, ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গত ১৪ ডিসেম্বর রাতে একটি মামলা করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। এজাহারে ফয়সাল করিম মাসুদসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। হত্যাচেষ্টার পরিকল্পনা ও অর্থের জোগানদাতা পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে। হাদির মৃত্যুর পর এটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের ওয়েবসাইটে গত ২৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায় ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় হামলাকারীর ২ সহযোগী ভারতে আটক হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম।

প্রথম আলো-ডেইলি স্টারে হামলার ঘটনায় গ্রেফতারের তথ্য

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে বাংলা ট্রিবিউনের ওয়েবসাইটে গত ২৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় সেদিন পর্যন্ত মোট গ্রেফতারের সংখ্যা ২৮। এর আগে গত ২২ ডিসেম্বর উক্ত হামলার ঘটনায় আলামতসহ ১৭ জনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছিল ডিএমপি।

দ্যা ডেইলি স্টারের ওয়েবসাইটে গত ২৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে গ্রেফতারের সংখ্যা ৩২ জন উল্লেখ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার উভয় পত্রিকার কর্তৃপক্ষই মামলা করেছে। এর মধ্যে প্রথম আলোর মামলায় অজ্ঞাতনামা ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়। ডেইলি স্টারের মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে ৩৫০-৪০০ ব্যক্তিকে।

অর্থাৎ, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে৷

সুতরাং,হাদি হত্যার ঘটনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাউকে গ্রেফতার না করলেও প্রথম আলো-ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় অন্তত ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে দাবিতে প্রচারিত তথ্যটি আংশিক সত্য ও আংশিক মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: