ইথিওপিয়ার আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে একাধিক এআই-তৈরি ভিডিও প্রচার

গত ২৩ নভেম্বর (রবিবার) ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চলে অবস্থিত হাইলি গুব্বি নামের একটি আগ্নেয়গিরি কয়েক হাজার বছর পর প্রথমবারের মতো জেগে উঠেছে। স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের ‘গ্লোবাল ভলকানিজম প্রোগ্রাম’ এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ হাজার বছরে এটাই আগ্নেয়গিরিটির প্রথম অগ্ন্যুৎপাত। ফ্লাইটরাডার২৪-এর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অগ্ন্যুৎপাত থেকে নির্গত ছাইয়ের মেঘ লোহিত সাগর পেরিয়ে প্রথমে ইয়েমেন ও ওমান, এরপর পাকিস্তান ও ভারতের দিকেও ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বিমান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।

এ অবস্থার মধ্যেই অগ্ন্যুৎপাতের দৃশ্য দাবিতে একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে ধোঁয়াসহ লাভা ও আগুনের প্রবাহ দেখা যায়।

এই ভিডিওসহ ফেসবুকে প্রচারিত দাবি দেখুন: এখানে, এখানে, এখানে

আরও একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়, ‘লাভার স্রোত মানুষের বাড়িঘরে ঢুকে যাচ্ছে।’ সেই ভিডিওতে দেখা যায়, পাহাড়ি ঢাল বেয়ে বিশাল লাভার প্রবাহ লোকালয়ের দিকে নেমে আসছে এবং টিনশেড বাড়ির সামনে দিয়ে আতঙ্কিত মানুষ দৌড়াচ্ছে।

এই ভিডিওসহ ফেসবুকে প্রচারিত দাবি দেখুন: এখানে, এখানে, এখানে

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচিত দুটি ভিডিও ইথিওপিয়ার হাইলি গুব্বি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের বাস্তব দৃশ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি এসব ভিডিওকে আসল দাবি করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে।

প্রথম ভিডিও যাচাই

প্রথম ভিডিও অনুসন্ধানে কোনো বিশ্বস্ত সূত্রেই এটি ইথিওপিয়ার আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের বাস্তব দৃশ্য বলে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং, অনির্ভরযোগ্য কিছু সূত্র থেকেই ভিডিওটি ছড়াতে দেখা গেছে।

বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধান করতে গিয়ে ‘Laughasores’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে চলতি বছরের ৫ জুলাই প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। আলোচিত ভিডিওটির সাথে তুলনা করলে দুটির দৃশ্যে মিল দেখা যায়। তবে ইউটিউবের ভিডিওটি আরও উচ্চমানের ও পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ। অর্থাৎ, দাবিকৃত ভিডিওটি আসলে ওই ভিডিওরই ক্রপ করা অংশ।

আলোচিত ইউটিউব ভিডিওর বর্ণনা থেকে জানা যায়, এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। চ্যানেলটির সব ভিডিওই শুধুমাত্র বিনোদনের উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয় এবং প্রতিটি ভিডিও কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার কাল্পনিক সিমুলেশন মাত্র। দর্শকরাও প্রায়ই এসব ভিডিওকে ‘এআই’ বা ‘ফেইক’ (নকল) হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি, ভিডিওটিতে ইউটিউবের ‘সম্পাদিত বা কৃত্রিম (সিন্থেটিক) কনটেন্ট’ লেবেল সক্রিয় রয়েছে। এই লেবেল দিয়ে নির্দেশ করে যে, এই শব্দ বা দৃশ্য উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন বা ডিজিটালভাবে তৈরি।

অন্যদিকে, ইথিওপিয়ায় অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনাটি ঘটে গত ২৩ নভেম্বর কিন্তু এই ভিডিওটি এর অন্তত ৪ মাস আগে থেকেই ইন্টারনেটে রয়েছে

বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে আলোচিত ভিডিওটি এআই-নির্ভর কনটেন্ট শনাক্তকরণ প্ল্যাটফর্ম হাইভ মোডারেশনে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ফলে দেখা যায়, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ শতাংশ।

অর্থাৎ, হাইলি গুব্বি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের বাস্তব দৃশ্য দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি মূলত এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি।

দ্বিতীয় ভিডিও যাচাই

দ্বিতীয় ভিডিওতে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে বিশাল লাভার স্রোত লোকালয়ের দিকে নামতে দেখা যায়। তবে বিশ্বস্ত কোনো সূত্রেই হাইলি গুব্বি আগ্নেয়গিরি থেকে এমন লাভা প্রবাহের তথ্য মেলেনি। এ বিষয়ে ২৫ নভেম্বর দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সেখানে কোনো লাভা বা ম্যাগমার প্রবাহ ছিল না; বরং বিস্ফোরণধর্মী অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ গ্যাস ও ছাইয়ের স্তম্ভ নির্গত হয়। ২৬ নভেম্বরের আরেক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গলিত লাভা প্রবাহিত হওয়ার বদলে দৃশ্যজুড়ে দেখা গেছে ঘন ছাই ও গ্যাসীয় পদার্থের বিশাল স্তম্ভ।

অন্যদিকে, ২৪ নভেম্বর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আফার অঞ্চলের হাইলি গুব্বি আগ্নেয়গিরির পাশের আফদেরা গ্রামের স্থানীয় প্রশাসক মোহাম্মদ সেইড জানান, এখন পর্যন্ত কোনো মানুষ বা গবাদি পশুর মৃত্যু হয়নি। তবে অনেক গ্রাম ছাইয়ে ঢেকে গেছে, যার ফলে গবাদি পশুর খাবারের অভাব দেখা দিয়েছে।

ভিডিওটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এতে ‘q3uk’ লেখা একটি জলছাপ রয়েছে। সেই সূত্র ধরে একই ইউজারনেমের টিকটক অ্যাকাউন্টে আলোচিত ভিডিওটি পাওয়া যায়। প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা যায়, সেখানে একই বিষয়বস্তুর আরও কয়েকটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে, যার একটির পাশে টিকটকের ‘Contains AI-generated media’ লেবেল যুক্ত আছে। প্রোফাইলে ‘Al-ghamdi’ নাম এবং আরবি ভাষার (,) কনটেন্ট ব্যবহারের ভিত্তিতে বোঝা যায়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। অথচ ইথিওপিয়া আফ্রিকার একটি দেশ, তাই যদি এটি সত্যিকারের কোনো ঘটনা হতো তবে ভিডিওটি সাধারণত স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী, সংবাদমাধ্যম বা দেশসংশ্লিষ্ট সূত্র থেকেই প্রথমে ছড়ানোর কথা। কিন্তু এখানে উল্টো একটি বিদেশি টিকটক অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি ছড়াতে দেখা যাচ্ছে।

বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ভিডিওটি এআই-তৈরি কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল ডিপফেক-ও-মিটারের ‘AVSRDD (2025)’ মডেল এবং হাইভ মডারেশনের মাধ্যমে পরীক্ষা করে রিউমর স্ক্যানার। উভয় টুলের বিশ্লেষণেই দেখা যায়, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ শতাংশ।

অর্থাৎ, হাইলি গুব্বি আগ্নেয়গিরির লাভার স্রোত মানুষের বাড়িঘরে ঢুকে যাচ্ছে দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি মূলত এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি।

সুতরাং, এআই দিয়ে তৈরি আলোচিত দুটি ভিডিওকে ইথিওপিয়ার হাইলি গুব্বি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের দৃশ্য দাবিতে প্রচার করা হয়েছে; যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: