গত ৮ বছরে দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি- স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন দাবিটি মিথ্যা 

দেশের বেশ কিছু জেলায় হুট করেই শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। বেশ কিছু শিশুমৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এরই প্রেক্ষিতে গতকাল (২৯ মার্চ) ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে গিয়ে সাংবাদিকদের সামনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল দাবি করেন, আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে এবং এরপর ভ্যাকসিন কোনো গভর্নমেন্ট দেয়নি।

উক্ত বক্তব্যের ভিডিও দেখুন এখানে

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৮ বছরে দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল যে দাবি করেছেন তা সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, পাঁচ বছর আগে ২০২০ সালেও হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচী নিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার যা ২০২১ সাল পর্যন্ত চলমান ছিল। কর্মসূচীর বাইরেও নিয়মিত টিকা দেওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে।

এ বিষয়ে ওপেন সোর্স অনুসন্ধানে ফেসবুকেই ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারির মধ্যে অসংখ্য পোস্ট খুঁজে পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার, যেগুলোতে সেসময় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের আওতায় শিশুদের টিকা দেওয়ার সময়ের ছবিসহ আনুষ্ঠানিক তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। (এ সংক্রান্ত কিছু পোস্টের আর্কাইভ দেখুন , , , , , )

এসব পোস্টের তথ্যের সূত্র ধরে ইউনিসেফের বাংলাদেশ শাখা থেকে প্রকাশিত ২০২১ সালের ২১ এপ্রিলের একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির সন্ধান পায় রিউমর স্ক্যানার। এই বিজ্ঞপ্তিসূত্রে জানা যাচ্ছে, মহামারির প্রথম দিকের মাসগুলোতে টিকাদান সেবা ব্যাহত হতে শুরু করলেও ২০২০ সালের জুনে বাংলাদেশ রুটিন টিকাদান পরিষেবা পুনরায় শুরু করে এবং নিয়মিতভাবে এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। দেশটি ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সফলভাবে হাম ও রুবেলার গণটিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, যার আওতায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

মূলত, ফেসবুকে যে পোস্টগুলো পাওয়া যাচ্ছে তা এই গণটিকাদান কর্মসূচীর আওতায়ই দেওয়া হয়েছে।

সে সময় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সংস্থা ও সরকারের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই কমর্সূচীর প্রচারণার ছবিও পাওয়া গেছে ফেসবুকে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি যে সত্য নয় তা স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জাতীয় দৈনিক আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছেন, এটি সত্য নয়; টিকা ইপিআইয়ের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ এবং সব সময় দেওয়া হয়। নিয়মিত টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে, তাই কয়েক বছর পরপর ক্যাম্পেইন করা হয়।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘অনেক শিশু ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। তাই টিকাদানের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সর্বশেষ ২০২০ সালে ক্যাম্পেইন চালিয়েছে; ২০২৪ সালে করার পরিকল্পনা থাকলেও তা হয়নি। এপ্রিলে নতুন ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা রয়েছে। গ্যাভির সহায়তায় সারা দেশে হামের টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি চার বছর অন্তর ফলোআপ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়, যাতে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা যায়।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) বাইরেও বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে হামের টিকা পাওয়া যায়। সাধারণত বেসরকারি পর্যায়ে এমএমআর (মিজেলস, মাম্পস, রুবেলা) টিকা দেওয়া হয়, যা হামের পাশাপাশি মাম্পস ও রুবেলা থেকেও সুরক্ষা দেয়। চলতি বছরও এমন টিকা দেওয়ার পোস্ট পাওয়া গেছে ফেসবুকে।

টিকাদান কর্মসূচী নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা বিভাগ (ইপিআই) এর নিজস্ব ড্যাশবোর্ড রয়েছে যেখানে বছরভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ সংক্রান্ত ডাটাবেজ থেকে জানা যায়, অন্তত ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতিবছরই এই টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে। এই হার কখনোই ৭০ শতাংশের নিচে নামেনি৷ তবে ২০২৫ সালের কোনো তথ্য এই ডাটাবেজে নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা বিভাগের (ইপিআই) নিজস্ব ড্যাশবোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হামের টিকাদান হার কখনোই ৮১ শতাংশের নিচে নামেনি। তবে ২০২৫ সালে এই হার দাঁড়িয়েছে ৫৬.৫ শতাংশে। তবে টিকা কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ড্যাশবোর্ডের তথ্য অসম্পূর্ণ।

অর্থাৎ, গত ৮ বছরে হামের টিকা সরকার দেয়নি বলে যে দাবি ছড়াচ্ছে তা সঠিক নয়। ২০২০ সালেও সরকার হামের টিকার কর্মসূচীর আওতায় টিকা দিয়েছে। এছাড়া, কর্মসূচীর বাইরেও নিয়মিত টিকা দেওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে।

সুতরাং, গত ৮ বছরে দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের দাবিটি মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: