হেমা চাকমা ডাকসুকে মাদকের আড্ডাখানা ও বেশ্যাখানা বলেননি, বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ প্রচারে বিভ্রান্তি

গত ২৪ জানুয়ারি রাতে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়া ইউনিয়নের কাটাখালী এলাকায় বরগুনা-২ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ডা. সুলতান আহমেদের নির্বাচনি জনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) মাদকের আড্ডাখানা এবং বেশ্যাখানা ছিল বলে মন্তব্য করেছেন বরগুনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মো. শামীম আহসান। এরপর গতকাল (২৫ জানুয়ারি) উক্ত বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাঁর ওই বক্তব্যের প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ সমাবেশ ও তাঁর কুশপুতুল দাহ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা। এরই প্রেক্ষিতে, ‘ডাকসুকে মাদকের আড্ডাখানা এবং বে/শ্যা/খানা বলে কটুক্তি করলেন নির্বাচনে হেরে যাওয়া হেমা চাকমা!’ শীর্ষক দাবিতে একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে।

ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন: এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ডাকসু নেত্রী হেমা চাকমা এমন কোনো মন্তব্য করেননি এবং তিনি ডাকসু নির্বাচনে হারেননি। প্রকৃতপক্ষে, জামায়াতের বরগুনা জেলার এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মো. শামীম আহসানের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে করা বিক্ষোভ সমাবেশে হেমা চাকমার দেওয়া দীর্ঘ বক্তব্যের একটি অংশ কর্তন করে উক্ত দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে। এছাড়া, ডাকসু নির্বাচনে কার্যকরী সদস্য পদে বামপন্থী সাতটি সংগঠনের প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ থেকে জয়ী হয়েছিলেন হেমা চাকমা।
অনুসন্ধানের শুরুতে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করে হেমা চাকমা কর্তৃক এমন মন্তব্য করার সপক্ষে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে, হেমা চাকমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে গতকাল (২৫ জানুয়ারি) রাতে প্রচারিত একটি লাইভ ভিডিও পাওয়া যায়। ‘ডাকসু’কে মাদকের আড্ডা এবং বেশ্যাখানা বক্তব্যের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদী মিছিল ও কুশপুত্তলিকা দাহ’ ক্যাপশনে প্রচারিত ৫১ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের লাইভ ভিডিও পাওয়া যায়। উক্ত লাইভের ৩৯ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের পর থেকে হেমা চাকমাকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। তিনি ৪৫ মিনিট পর্যন্ত অর্থাৎ, ০৬ মিনিট বক্তব্য দেন। কিন্তু, পুরো বক্তব্যে তিনি নিজে ডাকসুকে মাদকের আড্ডাখানা বা বেশ্যাখানা বলেননি বরং, ভিডিওতে হেমা চাকমা জামায়াতের বরগুনা জেলার এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মো. শামীম আহসানের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রতিবাদ জানান এবং মো. শামীম আহসানকে উদ্ধৃত করে বক্তব্য দেন। যা মূল ভিডিও থেকে কর্তন করে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।
উক্ত বিক্ষোভ সমাবেশের একাধিক ভিডিও বিভিন্ন গণমাধ্যমেও পাওয়া যায়। সেগুলো বিশ্লেষণ করেও হেমা চাকমাকে আলোচিত মন্তব্যটি করতে শোনা যায়নি বরং মো. শামীম আহসানকে উদ্ধৃত করে তার বক্তব্যের সমালোচনা করে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। দেখুন: প্রথম আলো, ইত্তেফাক, একাত্তর টিভি, বাংলাদেশ প্রতিদিন।
পাশাপাশি, হেমা চাকমা গতকাল (২৫ জানুয়ারি) তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া একটি পোস্টে বলেন, সাংবাদিক হিসেবে প্রথম কাজ অথেনটিক খবর ছড়ানো এবং ভুল-ভাল তথ্য না দেয়া। এই বাটপার এই দুটো কাজই করতেছে।

এরপর, হেমা চাকমা ডাকসু নির্বাচনে হেরেছিলেন কি না সেবিষয়ে অনুসন্ধান করে রিউমর স্ক্যানার টিম। প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করে প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর ‘নির্বাচনী প্রচারে বাধা পেয়েছি বারবার: হেমা চাকমা’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। উক্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ডাকসু নির্বাচনে কার্যকরী সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছেন বামপন্থী সাতটি সংগঠনের প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’–এর প্রার্থী হেমা চাকমা। তিনি এই প্যানেল থেকে ডাকসুতে জয়ী একমাত্র প্রার্থী। হেমার প্রাপ্য ভোট ৪ হাজার ৯০৮। এর মধ্যে জগন্নাথ হলে পেয়েছেন ১ হাজার ১২৫, রোকেয়া হলে ৭০০, সুফিয়া কামাল হলে ৫১৪ ও শামসুন্নাহার হলে ৬২৫। হেমা শামসুন্নাহার হলে থাকেন।
একই তথ্যে সংবাদ প্রকাশ করেছিল– জাগো নিউজ, যুগান্তর, দেশ রূপান্তর।
অর্থাৎ, হেমা চাকমা ডাকসু নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার দাবিটিও সঠিক নয়।
সুতরাং, ‘ডাকসুকে মাদকের আড্ডাখানা এবং বে/শ্যা/খানা বলে কটুক্তি করলেন নির্বাচনে হেরে যাওয়া হেমা চাকমা!’ শীর্ষক দাবিটি বিভ্রান্তিকর।
তথ্যসূত্র
- Hema Chakma- Facebook Live
- Prothom Alo- Facebook Video
- Ittefaq- Facebook Video
- Ekattor tV- Facebook Video
- Bangladesh Pratidin- Facebook Video
- Hema Chakma- Facebook Post
- Prothom Alo- নির্বাচনী প্রচারে বাধা পেয়েছি বারবার: হেমা চাকমা
- JagoNews- স্রোতের বিপরীতে টিকে রইলেন হেমা চাকমা
- Jugantor- হেমা ও সর্বমিত্র চাকমার বিজয়ে পাহাড়ে আনন্দ
- Desh Rupantor- ডাকসুতে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেও জয়ী যারা

