দুর্গাপূজার বিষয়ে দেওয়া স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার মন্তব্য দাবিতে একাত্তর টিভির নামে সম্পাদিত ফটোকার্ড প্রচার 

সম্প্রতি অনলাইনে দাবি প্রচার করা হয়েছে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, “দুর্গাপূজা হলো মদ ও গাঁজার সমাবেশের উৎসব”।

এক্ষেত্রে মূলধারার গণমাধ্যম ‘একাত্তর টিভি’র ফটোকার্ডের আদলে একটি ফটোকার্ডে আলোচিত দাবিটি ইংরেজিতে লিখে প্রচার করা হয়।

এরূপ দাবিতে এক্সে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

উল্লেখ্য, আলোচিত দাবিটি ভারত থেকে পরিচালিত কিছু অ্যাকাউন্ট থেকেও প্রচার হতে দেখা যায়।।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী দুর্গাপূজাকে মদ ও গাঁজার সমাবেশের উৎসব বলেননি এবং একাত্তর টিভিও এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। প্রকৃতপক্ষে তিনি জানান দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘পূজায় মদ-গাঁজার আসর বসানো যাবে না’ যা নিয়ে একাত্তর টিভির ফেসবুক পেজেও ফটোকার্ড প্রকাশ হয়েছে। একাত্তর টিভির মূল ফটোকার্ডে থাকা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্য বিকৃত করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করলে তাতে মূলধারার গণমাধ্যম ‘একাত্তর’ টিভির লোগো দেখতে পাওয়া যায়। এরই সূত্র ধরে অনুসন্ধানে একাত্তর টিভির ফেসবুক পেজে গত ৮ সেপ্টেম্বরে আলোচিত ফটোকার্ডটির মূল ফটোকার্ড পাওয়া যায়। ফটোকার্ডটির সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডটির লেখা ব্যতীত বাকী সবকিছুর মিল পাওয়া যায়। একাত্তর টিভির মূল ফটোকার্ডটিতে বলা হয়, ‘পূজায় মদ-গাঁজার আসর বসানো যাবে না: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা’।

পরবর্তী অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যম ‘চ্যানেল২৪’ এর ইউটিউব চ্যানেলে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার মূল বক্তব্যের ভিডিও গত ৮ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হতে দেখা যায়। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে বলতে শোনা যায়, “(দুর্গাপূজা) আমাদের হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় একটা অনুষ্ঠান, এটা খুবই ভালোভাবে হবে। এখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে তাদের যে একটা বড় ভূমিকা হলো তারাও ঐ জায়গায় সবসময় পুরা সময়টা দেখার জন্য দিনে তিনজন করে মনে হয় রাত্রে চারজন করে লোক, ২৪ ঘন্টা যেন এই মন্ডপটা একটা অবজারভেশনে থাকে এই ব্যবস্থা থাকবে। আর আমাদের থেকে আনসারের সদস্যরাও থাকবে এবং তারাও ঐ ২৪ ঘন্টা ওটা অবজার্ভ করবে যেন কোন ধরণের কোন রকমের কোথাও সমস্যা না হয়। আমরা একটা নতুন অ্যাপসও তৈরি করে দিয়েছি এবং ওটার মাধ্যমে যদি কোনোরকমের ঘটনা ঘটে সেটার সত্যতা আছে কি না ওটাও চেক করা যাবে। ঐ ঘটনা যে ঘটছে ওটার প্রতিকারও যেন সাথে সাথে নেওয়া যায় ওটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর এই পূজা উপলক্ষে অনেক সময় আশেপাশে যে মেলাগুলি হয় তারপর ওখানে গাঁজার আড্ডা বসে, মদের আড্ডা বসে, এগুলি কিন্তু এবার কোন অবস্থায় হওয়া যাবে না। কোন রকমের কোন মেলা হবে না বাট ঐ ছোটখাটো ২-১ টা দোকান থাকতে পারে যেটা ঐ কমিটির থেকে পার্মিশন নিয়ে তারা ঐ দোকানগুলি স্থাপন করতে পারবে। প্লাস আমাদের সব বাহিনীই থাকবে। সশস্ত্র বাহিনী থাকবে, পুলিশ থাকবে, আনসার থাকবে, র্যাব থাকবে, বিজিবি থাকবে।..”

এছাড়াও, এ বিষয়ে জাতীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’ এর ওয়েবসাইটে গত ৮ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘এবার পূজামণ্ডপের আশপাশে মেলা বসতে দেওয়া হবে না বলে জানান মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, পূজামণ্ডপের পাশে মেলা বসলে সেখানে গাঁজার আড্ডা বসে, মদের আড্ডা বসে। এবার কোনোভাবেই মেলা বসতে দেওয়া হবে না। তবে দুই–একটা দোকান থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই পূজা উদ্‌যাপন কমিটির অনুমতি নিয়ে দোকান স্থাপন করতে হবে।’

মূলধারার গণমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি স্টার’ এর ওয়েবসাইটে গত ৮ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জানান, এবার পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় সার্বিকভাবে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, আনসার, র‍্যাব ও বিজিবি মোতায়েন থাকবে। বিশেষ করে, সীমান্ত এলাকার মণ্ডপগুলোর মূল নিরাপত্তায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দায়িত্ব পালন করবে। একই সাথে, পূজামণ্ডপের আশেপাশে কোনো অবৈধ মেলা, গাঁজার আড্ডা বা মদের আড্ডা বসতে দেওয়া হবে না। আজ সোমবার (৮ সেপ্টেম্বর) শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আয়োজিত প্রস্তুতি সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

..এবার দুর্গাপূজায় মণ্ডপের আশেপাশে কোনো অননুমোদিত কার্যক্রম চলবে না উল্লেখ করে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই পূজা উপলক্ষে অনেক সময় আশেপাশে যে মেলাগুলি হয়, তারপর ওখানে গাঁজার আড্ডা বসে, মদের আড্ডা বসে—এগুলি কিন্তু এবার কোনো অবস্থাতেই হবে না। তবে, পূজা কমিটির অনুমতি নিয়ে ছোটখাটো দুই একটা দোকান থাকতে পারে বলে জানান তিনি।’

উল্লিখিত প্রতিবেদনগুলোর কোথাও “দুর্গাপূজা হলো মদ ও গাঁজার সমাবেশের উৎসব” এরূপ কোনো মন্তব্য স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার করার সপক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রকৃতপক্ষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে যাতে সুশৃঙ্খলভাবে পূজা আয়োজন করা যায় এবং সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘পূজামণ্ডপের আশেপাশে এবার মদ-গাঁজার আসর বসানো যাবে না’ যা বিকৃত করে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।

সুতরাং, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, “দুর্গাপূজা হলো মদ ও গাঁজার সমাবেশের উৎসব” শীর্ষক দাবিতে একাত্তর টিভির নামে প্রচারিত ফটোকার্ডটি সম্পাদিত।

তথ্যসূত্র

Share: