সোর্স যখন ‘ভুয়া’: বাংলাদেশের যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে যেভাবে ছড়ানো হলো অপতথ্য

২২ জানুয়ারি, ২০২৬। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি এই এলাকা (কুমিল্লা-১১, চৌদ্দগ্রাম) থেকেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। সেদিন বক্তব্যে তিনি হঠাতই দাবি করেন যে “ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রধান ভারতের সঙ্গে তিনটি শর্তে চুক্তি করেছেন। প্রথমত, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল যারা, তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র কিনতে হলে ভারতের অনুমতি নিতে হবে এবং ভারতের অনুমতি ছাড়া কোনো অস্ত্র কেনা যাবে না। তৃতীয়ত, এ দেশের ইসলামপন্থী দলগুলোকে দমন করতে হবে।” জামায়াতের প্রবীণ এই রাজনীতিবিদের আলোচিত এই বক্তব্য নিয়ে এরপর ফ্যাক্টচেক হলো, জানা গেল আনন্দবাজার এমন কিছুই জানায়নি।

সেবারই অবশ্য প্রথম নয়, জানুয়ারির শুরুর দিকে একই দাবির কিছুটা সংক্ষিপ্ত সংস্করণ ছড়ায় জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবিরের এক বক্তব্যেও। তিনিও আনন্দবাজারকে সূত্র হিসেবে দেখিয়ে দাবি করেন যে, “তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, যাতে বলা আছে তিনি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবেন না। এমন তিনটি চুক্তি রয়েছে।” এটিরও ফ্যাক্টচেক হয় সেসময়ই৷ কিন্তু শাহরিয়ার কবিরই কি এই অপতথ্য তৈরি করেছিলেন? নাকি অন্য কেউ ছড়িয়েছিল স্পর্শকাতর এই অপতথ্য? সাম্প্রতিক সময়ে আবারও কেন আলোচনায় বিষয়টি? রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট এই প্রতিবেদনে দাবিটির সূত্রপাত খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে। 

গত ১৮ মার্চ ফেসবুকে একটি ফটোকার্ড পোস্ট নজরে আসে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের। ফটোকার্ডের শিরোনামে বলা হচ্ছে, “ভারতের সম্মতি ছাড়া বাংলাদেশের ডিফেন্সের জন্য কোনো যুদধ বিমান আধুনিক অন্ত্র বা সরঞ্জাম ক্রয় করতে পারবে না, বললেন আসাম মুখ্যমন্ত্রী!” মজার ব্যাপার হচ্ছে, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ছবি ব্যবহার না করে ফটোকার্ডে ব্যবহার হচ্ছে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছবি! 

এই পোস্টে পাঁচ দিনের ব্যবধানে ১৮ হাজার রিয়েকশন এসেছে এবং আড়াই হাজারেরও বেশি শেয়ার হয়েছে। শুধু ফেসবুকেই নয়, সমজাতীয় প্রায় সব প্ল্যাটফর্মেই (ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, থ্রেডস) কিওয়ার্ড সার্চ করে মিলেছে একই দাবির পোস্ট। এই দাবিটি যে আনন্দবাজার সংক্রান্ত পুরোনো সেই দাবির সাথে ওতপ্রোতভাবেই জড়িত তা অবশ্য তখনও অজানা।

এই দাবিটি ক্রসচেক করার একেবারেই সাধারণ পদ্ধতি হচ্ছে এমন কিছু অমিত শাহ বা হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন কিনা তা কিওয়ার্ড সার্চ করে দেখা। রিউমর স্ক্যানার সেটাই করেছে। নানা উপায়ে অনুসন্ধান চালিয়ে তাদের এমন কোনো মন্তব্য করার প্রমাণ মেলেনি। আরো নিশ্চিত হতে ভারতীয় ফ্যাক্টচেকারদেরও শরণাপন্ন হয়েছে রিউমর স্ক্যানার। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আজতক বাংলা’র ফ্যাক্টচেক বিভাগের সদস্য ঋদ্ধীশ দত্ত বলছেন, দাবিটি তারাও দেখেছেন। তার প্রেক্ষিতে তারাও অনুসন্ধান করে দেখেছেন যে তাদের কেউ এমন কিছু বলেনি কোথাও।

রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট দাবিটির সূত্রপাত খোঁজার চেষ্টা করে৷ সহায়তা নেওয়া হয় ফেসবুকের অ্যাডভান্স সার্চ পদ্ধতির। নানা কিওয়ার্ড আর কৌশলে খুঁজতে গিয়ে আমাদের সামনে আসে গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর প্রবাসী কনটেন্ট ক্রিয়েটর বনি আমিনের করা একটি পোস্ট। বনি আমিন তার ফেসবুক পেজে সেদিন দাবি করেন, “রিসেন্টলি খুবই গোপন সূত্রে জানতে পারলাম—শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লোভে দাদাদের (ভারতের) তিনটি শর্ত মেনে সে (তারেক রহমান) দেশে ফিরছে।” (শব্দের মাঝের চিহ্নগুলো বাদ দেয়া হয়েছে)

বনি আমিনের দাবি অনুযায়ী শর্ত তিনটি হলো, “১. রিফাইন্ড B.A.L-কে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং সকল ব্যান তুলে দিতে হবে। ২. দাদাদের সম্মতি ছাড়া ডিফেন্সের জন্য কোনো আধুনিক সরঞ্জাম ক্রয় কিংবা কারো সঙ্গে কোনো চুক্তিতে যাওয়া যাবে না। ৩. জামায়াতে ইসলামি সহ অন্যান্য ইসলামী দলের ওপর হাসিনার মতো ৭১এর ‘চেতনানাশক বড়ি খাইয়ে, নাটক সাজিয়ে তাদের কারাগারে পাঠাতে হবে।”

দ্বিতীয় শর্তটি খেয়াল করুন। সাম্প্রতিক দাবির সাথে মিল পাচ্ছেন না? কিন্তু বনি আমিন কোনো সূত্র উল্লেখ করেননি এই তথ্যের, বলেছেন শুধুই সম্ভাবনার কথা।

পরদিন (২০ ডিসেম্বর) ফেসবুকে একটি পেজে সাবেক জাতিসংঘ মিশন স্টাফ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক গৌতম দাসের একটি বক্তব্যের ভিডিও দিয়ে দাবি করা হয়, “আনন্দবাজারে তারেকের সাথে দিল্লির ৩ সমঝোতা স্বীকার ! ভারতের দেওয়া যে তিনটি শর্ত মেনে নিয়ে তারেক রহমান দেশে ফিরছে।” শর্ত সেই তিনটিই।

গৌতম দাস তার নিজের ইউটিউব চ্যানেল ‘Behind Politics’ এ ২০ ডিসেম্বর ‘আনন্দবাজারে তারেকের সাথে দিল্লির সমঝোতা স্বীকার; তবুও তারেকের দেশে ফেরা নিয়ে ভারতের আপত্তি কেন?’ শিরোনামের ভিডিওটি প্রকাশ করেন। ২৫ মিনিটের কিছু বেশি সময়ের এই ভিডিওটি আমরা পর্যালোচনা করে দেখেছি, সেখানে তিন শর্ত সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। তিনি মূলত ১৯ ডিসেম্বরের আনন্দবাজারের একটি প্রতিবেদন নিয়ে আলাপ করেন। তার দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে আনন্দবাজারের ওয়েবসাইট থেকে প্রতিবেদনটির খোঁজ পাওয়া যায়। তবে প্রিমিয়াম সংস্করণ হওয়ায় বিনামূল্যে সংবাদটি পড়ার উপায় নেই। রিউমর স্ক্যানারের পক্ষ থেকে আনন্দবাজারের কলকাতা অফিসে যোগাযোগ করে প্রতিবেদনটির প্রিন্ট সংস্করণ সংগ্রহ করে দেখা যায়, ১৯ ডিসেম্বর পত্রিকাটিতে ছাপা হয় এই প্রতিবেদন।

সাংবাদিক অনির্বাণ দাশগুপ্তর লেখা এই প্রতিবেদনের একটি অংশে বলা হয়, “নয়াদিল্লির সমর্থন অনেকটাই নিশ্চিত করে ফেলেছেন বিএনপি-র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। বিদেশ মন্ত্রক সূত্রের খবর, বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যে চুক্তিগুলি রয়েছে, তাতে কোনও প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের মাটিকে কোনও ভাবে ভারত-বিরোধী কাজে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না, এই মর্মে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছে তারেকের কাছ থেকে।”

অর্থাৎ, আনন্দবাজারে যে দুই প্রতিশ্রুতির কথা বলা হচ্ছে তার সাথে আলোচিত তিন শর্তের মিল নেই। অথচ এই প্রতিবেদনকেই সূত্র হিসেবে দেখিয়ে দাবিটিকে বাস্তব হিসেবে ভিত্তি দেওয়ার চেষ্টা চলেছে।

দাবিটি এরপর ডালপালা মেলেছে। ২০ ডিসেম্বরেই প্রথমে অমিত শাহর ছবি ব্যবহার করে পোস্ট হতে থাকে একই দাবি। ২২ ডিসেম্বর ‘বিশ্বের তথ্য’ নামের একটি ফেসবুক পেজে অমিত শাহর একই ছবি দিয়ে দাবিটিকে ফটোকার্ড আকারে পোস্টের পর তা রীতিমতো ভাইরাল হয়ে যায়। কিন্তু পোস্টদাতা ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছবি ব্যবহার করলেও ফটোকার্ডে দাবিগুলো আসামের মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য হিসেবে প্রচার করেন। অবশ্য সকলেই যে অন্ধ বিশ্বাসে ফটোকার্ডটি শেয়ার করেছেন এমনও নয়। অন্য একটি পেজে অমিত শাহর ছবি বদলে দিয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার ছবিই ব্যবহার করে দাবিটি প্রচার করা হয়।

‘বিশ্বের তথ্য’ ফেসবুক পেজের তিন মাস পুরোনো ফটোকার্ডটিই সম্প্রতি ফের ছড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গত ডিসেম্বরে দেশে ফিরতে তিন শর্ত দেয় ভারত — এমন দাবিটি প্রথমে ভারতের পত্রিকা আনন্দবাজারের বরাত দিয়ে, এরপর দাবিটির একাংশ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তারপর আসামের মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য হিসেবে ছড়ানো হয়। দাবিটি এক পর্যায়ে এতটাই শক্ত ভিত্তি পায় যে তা বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তির বক্তব্যেও উঠে আসে। মাঝে কিছুটা স্তিমিত হলেও সম্প্রতি ফের দাবিটি ছড়াতে শুরু করেছে।

Share: