শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের রাফাল যুদ্ধ বিমানের মহড়ার দাবিটি ভুয়া

নানাসময়ে সেভেন সিস্টার্স খ্যাত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের বিষয়ে বাংলাদেশি নানা মানুষ নানা বক্তব্য দিয়েছেন। সম্প্রতি সেভেন সিস্টার্সের বিষয়ে ঢাকায় এক সমাবেশে এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর মন্তব্য নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। হাসনাত বলেছেন, “ভারতকে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, যারা আমার দেশের সার্বভৌমত্বকে বিশ্বাস করে না, যারা আমার দেশের সম্ভাবনাকে বিশ্বাস করে না, যারা ভোটাধিকারকে- মানবাধিকারকে বিশ্বাস করে না, যারা এ দেশের সন্তানকে বিশ্বাস করে না, আপনারা (ভারত) যেহেতু তাদের আশ্রয়–প্রশ্রয় দিচ্ছেন, কথা স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই–– ভারতের যারা সেপারেটিস্ট আছে, বাংলাদেশে আমরা তাদের আশ্রয়-প্রশয় দিয়ে যে সেভেন সিস্টার্স আছে সেটাকে ভারতে থেকে আলাদা করে দেবো।” এরই প্রেক্ষিতে গত ১৭ ডিসেম্বর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রচার করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘১৭/১২/২০২৫ | শিলিগুড়িতে ভারতের রাফাল যুদ্ধ বিমানের মহড়া – বাংলাদেশ সীমান্তে! বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ভারতের সেভেন সিস্টার দখলের হুমকির কারণে বাংলাদেশের কপালে কি আছে। সেটা নিয়ে চিন্তিত দেশবাসী’।

অর্থাৎ, দাবি করা হয়েছে, প্রচারিত ভিডিওটি হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের পর শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের রাফাল যুদ্ধ বিমানের মহড়ার দৃশ্যের।

এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

এরূপ দাবিতে ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রচারিত ভিডিওটি সম্প্রতি শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের রাফাল যুদ্ধ বিমানের মহড়ার দৃশ্যের নয় বরং, গত ২ মে ভারতের উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুরের গঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে ভারতীয় বিমান বাহিনীর উড্ডয়ন ও অবতরণ মহড়ার দৃশ্যকে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।

আলোচিত ভিডিওর বিষয়ে অনুসন্ধানে ভারত ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ANI’ এর এক্স অ্যাকাউটে গত ২ মে তারিখে প্রচারিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওটির সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওতে প্রদর্শিত দৃশ্যের তুলনা করলে হুবহু মিল পাওয়া যায়। পাশাপাশি, দুই ভিডিওতেই এএনআই এর লোগোরও সংযুক্তি পাওয়া যায়। এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে প্রচারিত ভিডিওটি মূলত এএনআই এর উক্ত পোস্ট থেকেই নেওয়া হয়েছে।

ভিডিওটির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে এএনআই এর পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, ‘ভারতের উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুরের গঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে ভারতীয় বিমান বাহিনী (আইএএফ) উড্ডয়ন ও অবতরণ মহড়া পরিচালনা করছে। যুদ্ধকাল বা জাতীয় জরুরি অবস্থার সময় বিকল্প রানওয়ে হিসেবে এই এক্সপ্রেসওয়ের সম্ভাবনা যাচাই করতেই এই মহড়ার আয়োজন করা হয়েছে।’ (অনূদিত)

এছাড়াও, অনুসন্ধানে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র ওয়েবসাইটে গত ২ মে তারিখে এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২ মে উত্তরপ্রদেশের গঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে ভারতীয় বিমান বাহিনী (আইএএফ) একটি বড় আকারের ফ্লাইপাস্ট ও অবতরণ মহড়া পরিচালনা করেছে। যুদ্ধবিমান ও পরিবহন বিমানের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ মহড়ার উদ্দেশ্য ছিল জরুরি অবস্থা বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বিকল্প রানওয়ে হিসেবে এক্সপ্রেসওয়েটির সক্ষমতা পরীক্ষা করা। প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, গঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েটি ভারতের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেখানে যুদ্ধবিমান দিনে ও রাতে উভয় সময়েই অবতরণ করতে পারে। এই মহড়া এমন এক সময়ে পরিচালিত হয়েছে, যখন মহড়ার মাত্র কয়েক দিন আগে গত ২২ এপ্রিল ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগাম অঞ্চলে সন্ত্রাসীদের হামলায় অনেকেই নিহত হন। সে ঘটনার পর ভারতীয় সামরিক বাহিনী শুধু স্থলভাগেই নয়, সমুদ্র ও আকাশসীমাতেও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থা অবলম্বন করেছিল।

এছাড়াও, আরো একাধিক ভারতীয় মূলধারার গণমাধ্যমে আলোচিত ভিডিওর বিষয়ে সেসময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে একইরকম তথ্য জানা যায়। তাছাড়া, অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভারতের উত্তর প্রদেশের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি বা কাছাকাছি কোনো সীমান্ত নেই।

সুতরাং, গত ২ মে ভারতের উত্তরপ্রদেশের শাহজাহানপুরের গঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে ভারতীয় বিমান বাহিনীর উড্ডয়ন ও অবতরণ মহড়ার দৃশ্যকে সম্প্রতি শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের রাফাল যুদ্ধ বিমানের মহড়ার ভিডিও দাবিতে প্রচার করা হয়েছে; যা মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: