ভারতীয় মুসলিম শিশুদের বিশেষ ট্রাভেল পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশে পুশইনের দাবিটি ভুয়া

সম্প্রতি, ভারতীয় মুসলিম শিশুদের বিশেষ ট্রাভেল পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছে দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।

ফেসবুকে প্রচারিত এমন ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

এছাড়াও আলোচিত ভিডিওটি প্রচারকারী Defence Research Forum DRF নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আরেকটি শিশুর ভিডিও প্রচার করা হয়। উক্ত ভিডিওর শিরোনামেও দাবি করা হয়, শিশুদের বাবা-মাকে জেলে আটকে রেখে শিশুদের বাংলাদেশে পাচার করে দিয়েছে ভারত। এমন দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাংলাদেশে ভারতীয় মুসলিম শিশুদের পুশেইন করার দাবিটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, ভিডিওতে দেখতে পাওয়া শিশুরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশি। এদের অনেকে এককভাবে বা বাবা-মায়ের সাথে বিভিন্ন সময় অবৈধভাবে ভারতে পারি জমিয়েছিলেন। যাদেরকে উভয় দেশের সরকারের সমঝোতার ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

এবিষয়ে অনুসন্ধানের শুরুতে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি পর্যালোচনা করে বেনাপোল ইমিগ্রেনের স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সাইন বোর্ড লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও ভিডিওটি সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করে রিউমর স্ক্যানার এতে তামিম হোসেন সবুজ লেখা একটি জলছাপও দেখতে পায়।

প্রাপ্ত তথ্যের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে একই নামের যশোরের বেনাপোলের একজন স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীর ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়া যায়। উক্ত ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি পর্যালোচনায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অ্যাকাউন্টটিতে আলোচিত ভিডিওটি প্রচারিত হতে দেখা যায়। তবে ভিডিওটির শিরোনামে বাংলাদেশে প্রেরিত শিশুদের বিশেষ ট্রাভেল পাসের মাধ্যমে পাঠানোর কথা উল্লেখ থাকলেও তারা ভারতীয় এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

উক্ত ভিডিওটি ব্যতিতও একই ঘটনায় তার ধারণ করা একাধিক ভিডিও অ্যাকাউন্টটিতে প্রচার করতে দেখা যায়। যার মাঝে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত দ্বিতীয় ভিডিওটির সন্ধানও পাওয়া যায়। প্রচারিত ভিডিওগুলোর একটিতে একজন শিশুকে বলতে শোনা যায়, ২০২৪ সালে ওই শিশু নিজেই বাংলাদেশ থেকে বর্ডার ক্রস করে ভারতে যায়। তাকে কেউ সেদেশে পাচার করেনি বলেও নিশ্চিত করে শিশুটি।

পাশাপাশি তার অ্যাকাউন্টে আরেকটি ভিডিও পাওয়া যায়, যেটিতে Rights Jessore এর আইডি কার্ড পরিহিত একজন নারীকে বলতে শোনা যায়, এই শিশুরা দীর্ঘদিন যাবৎ ভারতে ছিল তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ভারত সরকার শিশুদের উদ্ধার করে বিশেষ দলের মাধ্যমে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করেছে। এখন প্রয়োজনীয় তথ্যাদি যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তাদেরকে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

এঘটনায় তামিম হোসেন সবুজের সংবাদভিত্তিক ফেসবুক পেজ এস নিউজে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় ইমিগ্রেশন পুলিশ ২৮ জন শিশুকে বেনাপলি ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে।

প্রতিবেদনটিতে ইমিগ্রেশন পুলিশের বরাতে জানানো হয়, অধিকায়ের আশায় দালাল চক্রের প্রলোভনে এসব শিশুদের নিয়ে তাদের মায়েরা অবৈধ পথে ভারতে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলে তাদের দমদম কারাগারে রাখা হয়। এ সময় শিশুদের বিভিন্ন সরকারি শেল্টার হোমে পাঠানো হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই ও দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুমন্যে বিশেষ ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে তাদের দেশে ফেরানো হয়।

পরবর্তীতে আলোচিত দাবিটির বিষয়ে জানতে বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) মোঃ শামীম হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিউমর স্ক্যানারকে জানান, ভারতীয় মুসলিম শিশুদের বিশেষ ট্রাভেল পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশে পুশইন করার দাবিটি সম্পূর্ণ ভুয়া। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যে ২৮ জন শিশুকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে তারা প্রত্যেকেই বাংলাদেশি।

এবিষয়ে বিস্তারিত জানতে শার্শা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফজলে ওয়াহিদের সাথেও যোগাযোগ করে রিউমর স্ক্যানার টিম। তিনি জানান, শিশুদের হস্তান্তরের কাজটি যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করেই করা হয়েছে। পুশইন করার দাবিটি সঠিক নয়। দুই দেশে আটকে পড়া এমন মানুষদের রিপাট্রিয়েশন বা প্রত্যাবাসন নিয়ে কাজ করে এমন কিছু এনজিও এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ছিল। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, রাইটস যশোর, জাস্টিস এন্ড কেয়ার, মহিলা আইনজীবী সমিতিসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তাদের মাধ্যমে এসব শিশুদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পরবর্তীতে রাইটস যশোরের তথ্য অনুসন্ধান কর্মকর্তা তৌফিকুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিউমর স্ক্যানারকে জানান, পরিবারের কাছে শিশুদের হস্তান্তর প্রক্রিয়া এনজিওগুলোর মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। রাইটস যশোর ১০ জন শিশুকে হস্তান্তরের দায়িত্ব পায় তাদের প্রায় সবাইকেই থানাতে থাকাকালীন পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়াও তাদের ভারতীয় হওয়া কিংবা পুশইন করা সংক্রান্ত যে তথ্যটি প্রচার হয়েছে সেটি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি।

সুতরাং, ভারতীয় মুসলিম শিশুদের বিশেষ ট্রাভেল পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশে পুশইন করার দাবিতে প্রচারিত এই তথ্যটি মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

  • তামিম হোসেন সবুজ Facebook Post
  • তামিম হোসেন সবুজ Facebook Post
  • তামিম হোসেন সবুজ Facebook Post
  • তামিম হোসেন সবুজ Facebook Post
  • Channel S News । চ্যানেল এস নিউজ Facebook Post
  • Statement of Md. Shamim Hossain, Director (Traffic), Benapole Land Port, Jessore
  • Statement of Fazle Wahid, Upazila Nirbahi Officer, Sharsha, Jessore   
  • Statement of Taufiquzzaman, Information Research Officer, Rights Jessore
  • Rumor Scanner’s Analysis
Share: