ভারতীয় ভিসার আবেদনের লাইন নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টের শিকার নানা ব্যক্তিবর্গ 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতা হারানোর পর বাংলাদেশিদের জন্য ভারত তাদের ট্যুরিস্ট ভিসা সেবা স্থগিত করে। দীর্ঘ প্রায় ২ বছর পর গত ২৮ জুন বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা ফের চালু করেছে ভারত। দীর্ঘদিন পর ভিসা চালু হওয়ায় আবেদনকারীদের ঢল নেমেছে রাজধানীসহ বিভিন্ন ভারতীয় ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারে। এসময় ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে আইভ্যাক কেন্দ্রে আবেদনকারীদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। আর এদিকে অনলাইনে এরই প্রেক্ষিতে ছড়িয়েছে একের পর এক অপতথ্য। এসব অপতথ্যের সূত্রপাত নানা ব্যঙ্গাত্মক ফেসবুক পেজ থেকে হলেও তা আসল দাবিতে দেদারসে ফেসবুক ভিত্তিক নানা গ্রুপ ও পেজে ছড়ানো হয়েছে।

ভিসা আবেদনকারীদের লাইনের প্রেক্ষিতে অনলাইনে অপতথ্যের প্রবাহ

গত ২৯ জুন ফেসবুকের নানা গ্রুপ ও অ্যাকাউন্টে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্য দাবিতে প্রচার করা হয়, ‘হাদি ভাইয়ের কবর জিয়ারত করতে আসা লোকের লাইন যমুনা ফিউচার পার্কে গিয়ে ঠেকছে। সেটাকে ভারতীয় ভিসার লাইন বলে অপপ্রচার করা থেকে বিরত থাকুন।’ কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, হাসনাত আবদুল্লাহ এরূপ কোনো মন্তব্য করেননি৷

প্রকৃতপক্ষে ‘Bengali Steam’ নামের এক ব্যঙ্গাত্মক পেজ থেকে সার্কাজম হিসেবে সূত্রপাত হওয়া পোস্টকে আসল দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। এসব পোস্টে নানা মানুষজন বিভ্রান্ত হয়ে তা হাসনাত আবদুল্লাহর আসল মন্তব্য ধরে নিয়েছেন এবং এসব পোস্টের মন্তব্য সেকশনে নেটিজেনদের হাসনাত আবদুল্লাহ ও ওসমান হাদিকে নিয়ে গালিগালাজ ও বিদ্রুপ করতে দেখা যায়।

এছাড়াও, উক্ত একই মন্তব্য দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মন্তব্য দাবিতেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম আমার দেশের ডিজাইন সংবলিত একটি ফটোকার্ড ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, এমন মন্তব্য করেননি মাহমুদুর রহমান এবং এরূপ দাবিতে আমার দেশও এমন কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশ করেনি। প্রকৃতপক্ষে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় আমার দেশের ভিন্ন একটি ফটোকার্ড সম্পাদনা করে আলোচিত এই ফটোকার্ডটি তৈরি করে প্রচার করা হয়েছে।

একই দিন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা আলম মিতুর মন্তব্য দাবিতে আরেকটি মন্তব্য অনলাইনে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। দাবি করা হয় যে ডা. মাহমুদা মিতু বলেছেন, ‘যে হাদি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জীবন দিলো, সেই ভারতীয় ভিসার জন্য আজকে যমুনার সামনে এতবড় লাইন; ইচ্ছা করতেছে সবকিছু ছেড়ে পাকিস্তান চলে যাই’। তবে এ দাবিটিও সঠিক নয়। মাহমুদা মিতু এমন কোনো মন্তব্য করেননি৷ মূলত, ‘Gupto Television’ নামের এক ব্যঙ্গাত্মক পেজ থেকে এ দাবির উৎপত্তি। এসব পোস্টের মন্তব্য সেকশনেও মাহমুদা মিতুকে উদ্দেশ্য করে নানাররকম গালিগালাজ করতে দেখা যায়। এসব কিছু পোস্টের কমেন্টে মাহমুদা মিতুকে দেশ ছেড়ে চলে যেতেও বলা হয়।

এছাড়া, প্রায় একই সময়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ.এস.এম. শাহরিয়ার কবিরের মন্তব্য দাবিতে আরেকটি ফটোকার্ড বেশ কিছু ফেসবুক গ্রুপে প্রচার করা হয়েছে। এসব ফটোকার্ডে শাহরিয়ার কবিরের মন্তব্য দাবিতে প্রচার করা হয়েছে, ‘পাকিস্তান পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দেশ; কারো ঘুরতে যাওয়ার দরকার হলে পাকিস্তান যেতে পারে অথচ সেটা বাদ দিয়ে সবাই ভারতীয় ভিসার জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছে’। মূলত, এ পোস্টের সূত্রপাতও ‘Gupto Television’ নামের ব্যঙ্গাত্মক পেজ থেকে। প্রকৃতপক্ষে শাহরিয়ার কবির এরূপ কোনো মন্তব্য করেননি। কিন্তু অনলাইনে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে শাহরিয়ার কবিরের আসল মন্তব্য ধরে তাকে ও তার পরিবারের উদ্দেশ্যে গালিগালাজ করেন।

তাছাড়া, ভারতীয় ভিসার জন্য আবেদন প্রসঙ্গে শাহরিয়ার কবিরের মন্তব্য দাবিতে আরেকটি ফটোকার্ডও অনলাইনে প্রচার করা হয়েছে। প্রচারিত এ ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে শাহরিয়ার কবির বলেছেন, ‘যারা ভারতীয় ভিসার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছে তারা সবাই স্বৈরাচারের দোসর; তারা ইসলামের শত্রু’। তবে এ দাবিটিও সঠিক নয়। মূলত, ‘দৈনিক মোল্লার দেশ’ নামক একটি ব্যাঙ্গাত্মক পেজ থেকে এ দাবির সূত্রপাত হয়েছে।

পাশাপাশি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনির মন্তব্য দাবিতেও একটি ফটোকার্ড অনলাইনে প্রচার করা হয়। এতে দাবি করা হয় গোলাম মাওলা রনি বলেছেন, ‘যমুনায় ইন্ডিয়ান ভিসা সেন্টারের সামনে আজকে যে ভীড় দেখলাম আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি এনসিপির কোনো সমাবেশে এত লোক দেখি নাই’। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, গোলাম মাওলা রনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি। ‘Gupto Television’ নামের ব্যঙ্গাত্মক পেজটি থেকেই এ দাবিরও উৎপত্তি

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদের মন্তব্য দাবিতেও আরেকটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়। ফটোকার্ডটিতে দাবি করা হয়, আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেছেন, ‘ভেবেছিলাম ৩৬ জুলাই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি কিন্তু আজকে ভারতীয় ভিসা সেন্টারের সামনে লাইন দেখে মনে হলো আমরা এখনো ভারতের গোলামই রয়ে গেছি!’ কিন্তু আসাদুজ্জামান ফুয়াদ আসলে এমন কোনো মন্তব্য করেননি। ‘Gupto Television’ নামের ব্যঙ্গাত্মক পেজ থেকে সর্বপ্রথম এ ভুয়া দাবি প্রচার করা হয়।

এছাড়াও, গত ৩০ জুন ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদের মন্তব্য দাবিতে প্রচার করা হয়, ‘আজকে যারা ভারতীয় ভিসার জন্য যমুনা ফিউচার পার্কে লাইনে দাঁড়িয়েছে, সবার বাংলাদেশী নাগরিকত্ব বাতিল করা হোক।’ তবে এ দাবিটিও সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে ‘Gupto Television’ নামের ব্যঙ্গাত্মক পেজ থেকে এ দাবিরও সূত্রপাত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ এর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমার মন্তব্য দাবিতেও একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়েছে। এ ফটোকার্ডে জুমার মন্তব্য দাবিতে প্রচার করা হয়েছে, ‘আজকে যারা ভারতীয় ভিসার জন্য যমুনার সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছে, তাদের ভিতরই হাদি ভাইয়ের খু/নি লুকিয়ে আছে’। দাবিটি বেশ কিছু ফেসবুক গ্রুপে ছড়ালেও এ দাবিরও সূত্রপাত ‘Gupto Television’ নামের ব্যঙ্গাত্মক পেজ। প্রকৃতপক্ষে জুমা এমন কোনো মন্তব্য করেননি।

সার্কাজম পেজ থেকে সূত্রপাত হওয়া উপরোক্ত এমন ৮টি অপতথ্যের মধ্যে সার্কাজম পেজ ‘Gupto Television‘ এর কনটেন্টের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ‘Gupto Television’ পেজটি থেকে ৬টি অপতথ্যের সূত্রপাত যা শতকরা হিসেবে ৭৫ শতাংশ। এছাড়াও, ১টি করে অপতথ্যের সূত্রপাত হয়েছে ‘Bengali Steam‘ ও ‘দৈনিক মোল্লার দেশ‘ নামের ফেসবুক পেজ থেকে।

উপরোক্ত পোস্টগুলো ও এসব পোস্টের মন্তব্য সেকশন পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এদের প্রায় সবই কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগ ঘেঁষা গ্রুপ ও সমর্থক। এক্ষেত্রে উপরোল্লিখিত ভুয়া বক্তব্যের শিকার হওয়া প্রায় সব ব্যক্তিবর্গের প্রতি পূর্বের ক্ষোভ বা ঘৃণা বিদ্যমান থাকায় অনেকেই বাড়তি যাচাইবাছাই ছাড়াই মন্তব্য সেকশনে ব্যক্তি আক্রমণ করেছেন। এক্ষেত্রে বিশ্বকোষ ‘ব্রিটানিকা’য় উল্লিখিত ‘কনফার্মেশন বায়াস’ নামের এক প্রবণতার সাথে মিল পাওয়া যায়। ব্রিটানিকায় থাকা সংজ্ঞা অনুযায়ী, কনফার্মেশন বায়াস (Confirmation bias) হলো মানুষের এমন একটি প্রবণতা, যেখানে সে কেবল সেইসব তথ্যই খোঁজে, বোঝে বা মনে রাখে যা তার আগের বিশ্বাস বা ধারণার সাথে মিলে যায়। এটি এমন এক ধরণের মানসিক পক্ষপাতিত্ব যা মূলত নিজের অজান্তেই ঘটে থাকে এবং এর ফলে মানুষ নিজের মতামতের বিরোধী বা উল্টো তথ্যগুলোকে পুরোপুরি এড়িয়ে যায়।

উপরোল্লিখিত অপতথ্যের কমেন্টে থাকা ব্যক্তি আক্রমণ ও গালিগালাজের ক্ষেত্রে এ প্রবণতার মিল পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে দেখা যায়, উপরোল্লিখিত ভুয়া বক্তব্যের শিকার হওয়া ব্যক্তিবর্গরা ভারত ও আওয়ামীবিরোধী এমন একটি মনোভাব নানা আওয়ামী সমর্থকদের কাছে রয়েছে এবং যখনই ভারতবিরোধী কোনো বক্তব্য তাদের সামনে এসেছে, তা তাদের পূর্ব বিশ্বাসের সাথে মিলে যাওয়ায় বাড়তি যাচাই ছাড়াই সত্য ধরে মন্তব্য করেছেন।

সার্বিকভাবে পর্যালোচনায় দেখা যায় এসব ক্ষেত্রে মূলত কর্মসূচি নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগের সমর্থকরাই মূলত অনলাইনে এরূপ দাবি নানা ফেসবুক গ্রুপে পোস্টের মাধ্যমে ছড়িয়েছেন। এক্ষেত্রে সূত্রপাত হওয়া ব্যঙ্গাত্মক পেজগুলো পর্যবেক্ষণে দেখা যায় এসব পেজও মূলত আওয়ামীঘেঁষা এবং নানা ট্রেন্ডিং বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত নানা ব্যক্তিবর্গকে টার্গেট করে তাদের নামে এসব ভুয়া বক্তব্য প্রচার করে থাকে। এছাড়া এসব পোস্টে কোনো ডিসক্লেইমারের উল্লেখ না থাকায় এবং ডিজাইন বেশ পরিপাটি হওয়ায় নেটিজেনদের অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে ভুয়া বক্তব্যের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ও তাদের পরিবারকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করে থাকেন। এক্ষেত্রে নারীদেরকে বেশ কুৎসিতভাবে আক্রমণ করা হয়ে থাকে।

Share: