সামগ্রিক অর্থে নয়, মাউন্ট এভারেস্ট সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা বিবেচনায় পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ

মাউন্ট এভারেস্ট নেপাল ও চীন সীমান্তের হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত। ৪০-৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে ভারত-অস্ট্রেলিয়া ও ইউরেশিয়া টেকটনিক প্লেটের সংর্ঘষের ফলে হিমালয় পর্বতমালা গঠিত হয়। পরবর্তীতে, প্লেইস্টোসিন যুগে হিমালয় পর্বতমালা আজকের আকার পায়। হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত পর্বতগুলোর মধ্যে মাউন্ট এভারেস্ট সবচেয়ে উঁচু। পর্বতশৃঙ্গটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৯,০৩২ ফুট বা ৮৮৪৯ মিটার উঁচু। ব্রিটিশ সার্ভেয়র জেনারেল স্যার জর্জ এভারেস্টের নামে মাউন্ট এভারেস্টের নামকরণ করা হয়। 

পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতশৃঙ্গ কোনটি?

এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে জানা প্রয়োজন আমরা কোন প্রসঙ্গ কাঠামো ব্যবহার করে পর্বতের উচ্চতা নির্ধারণ করছি। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতের উচ্চতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিন ধরনের রেফারেন্স ফ্রেম বা প্রসঙ্গ কাঠামোর উল্লেখ পাওয়া যায়।

পদ্ধতি-১: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পর্বতের উচ্চতা নির্ধারণ

এ পদ্ধতিতে, একটি গড় সমুদ্রপৃষ্ঠকে রেফারেন্স ফ্রেম হিসেবে ধরে সেই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পর্বতটি কতটা উঁচু তা নির্ণয় করা হয়। এ পদ্ধতি সঠিকভাবে প্রয়োগের জন্য বিশ্বব্যাপী একটি গড় আদর্শ সমুদ্রপৃষ্ঠ নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো পর্বতের উচ্চতা মাপার ক্ষেত্রে এই আদর্শ সমুদ্রপৃষ্ঠকেই শূন্যদাগ ধরা হয় বা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকেই হিসাব শুরু হয়। উল্লেখ্য, এটিই বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক প্রচলিত পদ্ধতি। এ পদ্ধতি অনুসারে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী বিন্দুই হবে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত।

মাউন্ট এভারেস্ট

পদ্ধতি-২: পর্বতের পাদ বিন্দু থেকে উচ্চতা নির্ধারণ

পর্বতের উচ্চতা নির্ধারণে অনেকসময় পর্বতটির পাদ বিন্দু থেকে পর্বতের শীর্ষ বিন্দু পর্যন্ত পরিমাপ করা হয়। এক্ষেত্রে সমুদ্রপৃষ্ঠ বিবেচনায় নেওয়া হয় না। পর্বতটির অবস্থান যে স্থানেই হোক না কেন, পর্বতের শীর্ষ থেকে পাদ বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব মেপে এ পদ্ধতিতে পর্বতের উচ্চতা নির্ধারণ করা যায়। এ পদ্ধতি অনুসারে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পর্বত সেটি-ই যার পাদ বিন্দু ও শীর্ষ বিন্দুর মধ্যে দূরত্ব সবচেয়ে বেশি।

পদ্ধতি-৩: পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে উচ্চতা নির্ধারণ

এ পদ্ধতিতে পৃথিবীর কেন্দ্রকে রেফারেন্স ফ্রেম হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এরপর কোনো পর্বতের শীর্ষ পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে কতটা দূরে তা পরিমাপ করা হয়। এভাবে পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে পর্বত শীর্ষের মধ্যবর্তী দূরত্ব পরিমাপ করে পর্বতের দৈর্ঘ্য নির্ণয় করা হয়। এ পদ্ধতি অনুসারে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত হবে পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে দূরবর্তী বিন্দু।

যে পদ্ধতিতেই মাপা হোক না কেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত একই হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এমন হয় না। এর কারণ পৃথিবীর আকার ও ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর আকার ও ভূ-প্রকৃতির কারণে এই তিন পদ্ধতি অনুসারে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন পর্বতকে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত বলা যায়। বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করা যাক।

উদাহরণস্বরূপ, মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে প্রসঙ্গ কাঠামো হিসেবে সমুদ্রপৃষ্ঠ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, গড় আদর্শ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নির্ণয় করা হয়েছে মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা। সে হিসেবে মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা প্রায় ২৯,০৩২ ফুট বা ৮৮৪৯ মিটার। পৃথিবীর গড় আদর্শ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা নির্ধারণ করলে মাউন্ট এভারেস্ট-ই পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের ‘মুয়ানা কিয়া’ নামের একটি আগ্নেয়গিরির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১৩,৮০২ ফুট বা ৪,২০৫ মিটার। যা মাউন্ট এভারেস্টের মোট উচ্চতার অর্ধেকেরও কম। কিন্তু, যদি সমুদ্রপৃষ্ঠ বিবেচনায় না নিয়ে শুধুমাত্র পাদবিন্দু থেকে শীর্ষবিন্দুর মধ্যবর্তী দৈর্ঘ্য পরিমাপ করে পর্বতের উচ্চতা নির্ণয় করা হয় তবে মুয়ানা কিয়া’র প্রকৃত উচ্চতা হলো ৩৩,৪৯৭ ফুট বা ১০,২১১ মিটার। যা স্পষ্টতই মাউন্ট এভারেস্টের থেকে বড়। এর কারণ, মুয়ানা কিয়া’র বেশিরভাগ অংশই সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত।

তবে কি মুয়ানা কিয়া’কে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পর্বত বলা যায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব হাইল্যান্ড অ্যান্ড আইল্যান্ড এর সেন্টার ফর মাউন্টেইন স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক প্রফেসর মার্টিন প্রাইস বলেন, “এটা নির্ভর করছে আপনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখছেন। যদি পৃথিবীতে কোনো সমুদ্র না থাকত তবে বিষয়টি নিয়ে কোনো বিতর্কই থাকত না। তাছাড়াও, সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ যেখানে সমুদ্র নেই, সেসব গ্রহের পর্বতের সাথেও তুলনা করা যেত।”

অর্থাৎ, সমুদ্রপৃষ্ঠ বিবেচনায় না নিলে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের ‘মুয়ানা কিয়া’ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পর্বত।

অন্যদিকে, ইকুয়েডরের মাউন্ট চিম্বোরাজো আন্দিজ পর্বতমালার সবচেয়ে উঁচু পর্বত। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতের তালিকায় শীর্ষ ৩০ টির মধ্যে নেই। কিন্তু, ইকুয়েডরের মাউন্ট চিম্বোরাজো পর্বতের চূড়া পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী বিন্দু।

এর কারণ, আমাদের পৃথিবীকে সাধারণত গোল বলে বর্ণনা করা হয়, কিন্তু এটি আসলে পুরোপুরি গোলাকৃতির নয়। দুই মেরুর কাছে পৃথিবী কিছুটা চাপা, কাজেই আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে পৃথিবী আসলে উপ-বর্তুলাকার। আর সব গ্রহের মতোই মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এবং নিজের অক্ষের উপর ঘূর্ণনের কারণে সৃষ্ট কেন্দ্রাতিগ শক্তির প্রভাবে মেরু অঞ্চল কিছুটা চ্যাপ্টা, আর নিরক্ষীয় অঞ্চল কিছুটা চওড়া। এ কারণেই বিষুব রেখা বরাবর পৃথিবীর ব্যাসার্ধ মেরু বরাবর ব্যাসার্ধের চেয়ে ২১.৩৯ কিলোমিটার বেশি। চিম্বোরাজো পর্বত বিষুব রেখার মাত্র ১ ডিগ্রি দক্ষিণে অবস্থিত হওয়ায় পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে চিম্বোরাজো পর্বতের চূড়া সবচেয়ে দূরবর্তী স্থান। পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে চিম্বোরাজো পর্বতের চূড়ার এ দূরত্ব প্রায় ৩,৯৬৭ মাইল। যা কেন্দ্র থেকে এভারেস্টের চূড়ার দূরত্বের থেকেও ৬,৭৯৮ ফুট বা ২,০৭২ মিটার বেশি।

অর্থাৎ, ইকুয়েডরের চিম্বোরাজো পর্বতের চূড়া হলো কেন্দ্র পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী স্থান।

তাহলে, এখন প্রশ্ন হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পর্বত কোনটি? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর মার্টিন প্রাইস জানান, “সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পর্বত মাউন্ট এভারেস্ট, অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠ বিবেচনায় না নিলে মুয়ানা কিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পর্বত। যদিও চিম্বোরাজোকে সবচেয়ে বড় পর্বত দাবি করা একটু কঠিন, তবে সবকিছুই নির্ভর করছে দৃষ্টিকোণের ওপর।”

সৌরজগতের সবচেয়ে উঁচু পর্বতশৃঙ্গ কোনটি?

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পর্বতশৃঙ্গের সন্ধান তো করা হলো। এবার সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তমান গ্রহগুলোর ব্যাপারে আসা যাক। মঙ্গলগ্রহের অলিম্পাস মন্স হলো সৌরজগতের গ্রহগুলোতে অবস্থিত সবচেয়ে বড় পর্বত। পর্বতটির উচ্চতা প্রায় ২১.৯ মিটার। যা ‘মুয়ানা কিয়া’র উচ্চতার দ্বিগুণেরও বেশি। অর্থাৎ, সৌরজগতের গ্রহগুলোতে অবস্থিত পর্বতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু পর্বতটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পর্বতেরও দ্বিগুণ।

পরিশেষে, মাউন্ট এভারেস্টকে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত না বলে বরং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত বলাই সঠিক হবে। আর পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত কোনটি?- এমন প্রশ্নের জবাবে, “সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পর্বত মাউন্ট এভারেস্ট, সমুদ্রপৃষ্ঠ বিবেচনায় না নিলে মুয়ানা কিয়া আর পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী স্থান বিবেচনায় চিম্বোরাজো হলো সবচেয়ে বড় পর্বত”- বলাই সমীচীন হবে।

তথ্যসূত্র

Share: