১১ দলীয় জোটে ইসলামী আন্দোলনের থাকা নিয়ে ভারতের আপত্তি ছিল দাবিতে একাধিক গণমাধ্যমের ভুয়া ফটোকার্ড প্রচার

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ১১টি রাজনৈতিক দলের ‘১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ ব্যানারে জোটবদ্ধভাবে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। আসন সমঝোতা নিয়ে কয়েক দিনের টানাপোড়েনের পর গত ১৬ জানুয়ারি এই জোট ত্যাগ করে এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দেয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এরই প্রেক্ষিতে ‘জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে ইসলামী আন্দোলন নিয়ে আপত্তি ছিল ভারতের’ শীর্ষক দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আটটি গণমাধ্যমের লোগো ও ডিজাইন সংবলিত ফটোকার্ড প্রচার হতে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার।
এসব ফটোকার্ডের মধ্যে প্রথম আলো, যুগান্তর, ইত্তেফাক ও ইনকিলাবের ফটোকার্ডে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। যার মধ্যে একটিতে তাকে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। জনকণ্ঠ, আমাদের সময় এবং বার্তা বাজারের ফটোকার্ডে সূত্র হিসেবে ‘ভারতীয় হাই কমিশনার’ উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, আমার দেশের ফটোকার্ডে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামীর ছবি ব্যবহার করা হয়েছে এবং তার পরিচয় হিসেবে ভারতীয় ‘হাই কমিশনার’ উল্লেখ করা হয়েছে।

উক্ত দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে এবং এখানে।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ১১ দলীয় জোটে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের থাকা নিয়ে ভারতের আপত্তি ছিল দাবি করে উল্লিখিত গণমাধ্যমগুলো এরূপ কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রচার করেনি৷ প্রকৃতপক্ষে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনার মাধ্যমে এসব গণমাধ্যমের প্রচলিত ফটোকার্ডের ডিজাইনে আদলে আলোচিত ফটোকার্ডগুলো তৈরি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো পৃথকভাবে যাচাই করেছে রিউমর স্ক্যানার।
ইত্তেফাকের ফটোকার্ড যাচাই
ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এতে ইত্তেফাকের লোগো রয়েছে। উক্ত তথ্যের সূত্র ধরে ইত্তেফাকের ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করে আলোচিত শিরোনাম সংবলিত কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া, ইত্তেফাকের ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলেও উক্ত দাবির সপক্ষে বিষয়ে কোনো সংবাদের অস্তিত্ব মেলেনি। তাছাড়া, ইত্তেফাকের প্রচলিত ফটোকার্ডের শিরোনামের ফন্টের সাথে আলোচিত ফটোকার্ডটির শিরোনামের ফন্টের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

অর্থাৎ, ইত্তেফাকের লোগো ও ডিজাইন নকল করে আলোচিত দাবি সংবলিত এই ভুয়া ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রথম আলোর ফটোকার্ড যাচাই
আলোচিত ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ফটোকার্ডটিতে প্রথম আলোর লোগো রয়েছে এবং এটি প্রকাশের তারিখ হিসেবে ‘১৬ জানুয়ারি ২০২৬’ উল্লেখ করা রয়েছে।
উক্ত তথ্যের সূত্র ধরে প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করে আলোচিত দাবি সংবলিত কোনো ফটোকার্ড বা তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া, প্রথম আলোর ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলেও উক্ত দাবি সমর্থিত কোনো সংবাদ বা তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া, প্রথম আলোর প্রচলিত ফটোকার্ডের শিরোনামের ফন্টের সাথে আলোচিত ফটোকার্ডটির শিরোনামের ফন্টের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

অর্থাৎ, প্রথম আলোর লোগো ও ডিজাইন নকল করে আলোচিত দাবি সংবলিত এই ভুয়া ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
যুগান্তরের ফটোকার্ড যাচাই
ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এটিতে যুগান্তরের লোগো রয়েছে এবং এটি প্রকাশের তারিখ হিসেবে ‘১৬ জানুয়ারি ২০২৬’ উল্লেখ করা হয়েছে।
উক্ত তথ্যের সূত্র ধরে যুগান্তরের ফেসবুক পেজে প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো পর্যবেক্ষণ করে আলোচিত শিরোনাম সংবলিত কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া, যুগান্তরের ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলেও উক্ত দাবির বিষয়ে কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া, যুগান্তরের প্রচলিত ফটোকার্ডের শিরোনামের ফন্টের সাথে আলোচিত ফটোকার্ডটির শিরোনামের ফন্টের পার্থক্যও লক্ষ্য করা যায়।

অর্থাৎ, যুগান্তরের লোগো ও ডিজাইন নকল করে আলোচিত দাবি সংবলিত ভুয়া ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
ইনকিলাবের ফটোকার্ড যাচাই
ফটোকার্ডটিতে থাকা ইনকিলাবের লোগোর সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেল পর্যবেক্ষণ করে আলোচিত দাবি সমর্থিত কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদের অস্তিত্ব মেলেনি। এছাড়া, ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে এর শিরোনামে ব্যবহৃত ফন্টের সাথে ইনকিলাবের প্রচলিত ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ফন্টের অমিল পরিলক্ষিত হয়।

অর্থাৎ, ইনকিলাবের লোগো ও ডিজাইন নকল করে আলোচিত দাবি সংবলিত ভুয়া ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
জনকণ্ঠের ফটোকার্ড যাচাই
এ বিষয়ে অনুসন্ধানের শুরুতে আলোচিত ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ফটোকার্ডটিতে জনকন্ঠের লোগো রয়েছে এবং এটি প্রকাশের তারিখ ‘১৬ জানুয়ারি ২০২৬’ উল্লেখ করা হয়েছে।
উক্ত তথ্যাবলীর সূত্র ধরে জনকন্ঠের ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করে উক্ত তারিখে আলোচিত শিরোনাম সংবলিত কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া, জনকন্ঠের ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলেও উক্ত দাবি সমর্থিত কোনো সংবাদের অস্তিত্ব মেলেনি। তাছাড়া, জনকন্ঠের প্রচলিত ফটোকার্ডের শিরোনামের ফন্টের সাথে আলোচিত ফটোকার্ডটির শিরোনামের ফন্টের পার্থক্যও লক্ষ্য করা যায়।

অর্থাৎ, জনকণ্ঠের লোগো ও ডিজাইন নকল করে আলোচিত দাবি সংবলিত ভুয়া ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
বার্তা বাজারের ফটোকার্ড যাচাই
এ বিষয়ে অনুসন্ধানের শুরুতে আলোচিত ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ফটোকার্ডটিতে বার্তা বাজারের লোগো রয়েছে এবং এটি প্রকাশের তারিখ ‘১৬ জানুয়ারি ২০২৬’ উল্লেখ করা হয়েছে।
উক্ত তথ্যাবলীর সূত্র ধরে বার্তা বাজারের ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করে উক্ত তারিখে আলোচিত শিরোনাম সংবলিত কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া, বার্তা বাজারের ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলেও উক্ত দাবি সমর্থিত কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া, বার্তা বাজারের প্রচলিত ফটোকার্ডের শিরোনামের ফন্টের সাথে আলোচিত ফটোকার্ডটির শিরোনামের ফন্টের পার্থক্যও লক্ষ্য করা যায়।

অর্থাৎ, বার্তা বাজারের লোগো ও ডিজাইন নকল করে আলোচিত দাবি সংবলিত ভুয়া ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
আমাদের সময়ের ফটোকার্ড যাচাই
ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এতে আমাদের সময়ের লোগো এবং এটি প্রকাশের তারিখ হিসেবে ‘১৬ জানুয়ারি, ২০২৬’ উল্লেখ রয়েছে।
উল্লিখিত তথ্যাবলীর সূত্র ধরে অনুসন্ধানে আমাদের সময়ের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করে আলোচিত শিরোনাম সংবলিত কোনো ফটোকার্ড পাওয়া যায়নি। এছাড়া, আমাদের সময় এর ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলেও আলোচিত দাবি সমর্থিত কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি। তাছাড়া, আমাদের সময়ের প্রচলিত ফটোকার্ডের শিরোনামের ফন্টের সাথে আলোচিত ফটোকার্ডটির শিরোনামের ফন্টের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

অর্থাৎ, আমাদের সময়ের লোগো ও ডিজাইন নকল করে আলোচিত দাবি সংবলিত ভুয়া ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
আমার দেশের ফটোকার্ড যাচাই
ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ফটোকার্ডটিতে আমার দেশের লোগো রয়েছে এবং এটি প্রকাশের তারিখ ‘১৬ জানুয়ারি, ২০২৬’ উল্লেখ করা হয়েছে।
উক্ত তথ্যাবলীর সূত্র ধরে আমার দেশের ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করে উক্ত তারিখে আলোচিত শিরোনাম সংবলিত কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া, আমার দেশের ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলেও উক্ত দাবি সমর্থিত কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া, আমার দেশের প্রচলিত ফটোকার্ডের শিরোনামের ফন্টের সাথে আলোচিত ফটোকার্ডটির শিরোনামের ফন্টের পার্থক্যও লক্ষ্য করা যায়।

অর্থাৎ, আমার দেশের লোগো ও ডিজাইন নকল করে আলোচিত দাবি সংবলিত ভুয়া ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
উল্লিখিত গণমাধ্যমসমূহ ব্যতীত অন্য কোনো গণমাধ্যম কিংবা সংশ্লিষ্ট বিশ্বস্ত কোনো সূত্রেও আলোচিত দাবির সমর্থনে কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তাছাড়া, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের এক্স অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ করেও আলোচিত দাবির সপক্ষে কোনো পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, উল্লিখিত ফটোকার্ডগুলোতে
রণধীর জয়সওয়াল ও বিক্রম দোরাইস্বামীকে বর্তমানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বলে দাবি করা হয়েছে যেগুলো সঠিক নয়। বর্তমানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার হলেন প্রণয় ভার্মা। বিক্রম দোরাইস্বামী অক্টোবর ২০২০ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়া, রণধীর জয়সওয়াল কখনোই বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি বর্তমানে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সুতরাং, ভারতীয় হাইকমিশনারকে উদ্ধৃত করে ১১ দলীয় জোটে ইসলামী আন্দোলনের থাকা নিয়ে ভারতের আপত্তি ছিল দাবিতে উল্লিখিত গণমাধ্যমগুলোর নামে প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো ভুয়া ও বানোয়াট।
তথ্যসূত্র
- Rumor Scanner’s analysis
- Website: hcidhaka.gov.in
- Website: mea.gov.in
- Randhir Jaiswal: X Account

