ফরিদপুরে জেমসের কনসার্টে ধর্মীয় কারণে হামলা হয়নি

সম্প্রতি দেশি ও ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ভারতীয় কতিপয় গণমাধ্যমে একটি ভিডিওর দৃশ্য প্রচার করে দাবি প্রচার করা হয়েছে, ফরিদপুরে জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী জেমসের কনসার্টে তৌহিদি জনতা হামলা করেছে।

এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

জেমসের কনসার্টে ইসলামপন্থী উগ্রপন্থীদের হামলা দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমে এটিকে বাংলাদেশে চলমান শিল্পের উপর হামলার ধারাবাহিকতা হিসেবেও দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি, কিছু ভারতীয় গণমাধ্যমে দাবি প্রচার করা হয়, বলিউডের গানের ওপর ক্ষোভ থেকে এমন হামলা। এরূপ দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ প্রতিবেদন: হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা, এই সময়, রিপাবলিক বাংলা (ফেসবুক), নিউজ১৮ বাংলা (ফেসবুক), দ্যা টাইমস অফ ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, ফ্রি প্রেস জার্নাল, এবিপি লাইভ, ইন্ডিয়া টুডে (এক্স), টাইমস নাউ (ইউটিউব), ওয়ান ইন্ডিয়া হিন্দি (ইউটিউব), এখন কলকাতা (ফেসবুক), রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড (ইউটিউব), দ্যা স্টেটসম্যান (ফেসবুক), ক্যাপিটাল টিভি (ইউটিউব), নিউজএক্স লাইভ (ইউটিউব)।

এরূপ দাবিতে ভারতীয় নানা এক্স অ্যাকাউন্ট থেকেও পোস্ট করা হয়েছে। দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

এরূপ দাবিতে ভারতীয় ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ফরিদপুরে জেমসের কনসার্টে হামলার সাথে ধর্মীয় কোনো সম্পৃক্ততা নেই৷ প্রকৃতপক্ষে, গত ২৬ ডিসেম্বরে ফরিদপুর জিলা স্কুলে জেমসের কনসার্টটি শুধু নিবন্ধিত প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল। অনিবন্ধিত কয়েক হাজার বহিরাগত দর্শক সংগীতশিল্পী জেমসের কথা শুনে চলে এসে দেয়াল বেয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। এতে বাধা দেওয়ায় স্কুল প্রাঙ্গণের দর্শক ও মঞ্চের দিকে একের পর এক ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকেন। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা বাধা দিলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন যা আলোচিত পরিস্থিতির তৈরি করে।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যম ‘বাংলাভিশন’ এর ওয়েবসাইটে গত ২৭ ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে একটি ছবিরও সংযুক্তি পাওয়া যায়, যার সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওতে প্রদর্শিত দৃশ্যের মিল পাওয়া যায়। ঘটনা সম্পর্কে ‘বাংলাভিশন’ এর ওয়েবসাইটের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ফরিদপুর জিলা স্কুলের ১৮৫তম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের সমাপনী দিনে বহিরাগতদের হামলায় জেমসের (নগর বাউল) সংগীতানুষ্ঠান পণ্ড হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে স্কুল প্রাঙ্গণে জেমসের সংগীত পরিবেশনের কথা ছিল। প্রত্যক্ষদর্শী ও আয়োজক সূত্রে জানা যায়, অনুষ্ঠান শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে বহিরাগত কয়েকজনকে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশে বাধা দেওয়া হলে তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে মঞ্চ দখলের চেষ্টা করে। এ সময় স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে বিক্ষুব্ধরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতির অবনতি হলে রাত ১০টার দিকে আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ডা. মুস্তাফিজুর রহমান শামীম মঞ্চ থেকে ঘোষণা দেন, উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে জেমসের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে।’

এছাড়াও এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো’র ওয়েবসাইটে গত ২৭ ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে আয়োজক কমিটি সূত্রে বলা হয়, পুনর্মিলনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি শুধু নিবন্ধিত প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল। অনিবন্ধিত কয়েক হাজার বহিরাগত দর্শক সংগীতশিল্পী জেমসের কথা শুনে চলে আসেন। ভেতরে ঢুকতে না দেওয়ায় তারা পাশের মুজিব সড়কে অবস্থান নেন। পরে আয়োজক কমিটির পক্ষে বাইরে দুটি প্রজেক্টর লাগিয়ে দেওয়া হয়। তবে এতেও সন্তুষ্ট না হয়ে রাত সাড়ে নয়টার দিকে বহিরাগতরা দেয়াল বেয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। এতে বাধা দেওয়ায় স্কুল প্রাঙ্গণের দর্শক ও মঞ্চের দিকে একের পর এক ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকেন। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা বাধা দিলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তাদের ছোঁড়া ইটপাটকেলে স্কুল প্রাঙ্গণের ২৫ থেকে ৩০ জন আহত হন। এ সময় ৪ থেকে ৫ জন দেয়াল বেয়ে স্কুল প্রাঙ্গণের ভেতরে ঢুকে পড়লে জিলা স্কুলের ছাত্ররা তাদের চড়থাপ্পড় দেন এবং এক পর্যায়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হয়।

এছাড়াও, প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, জেমসের মুখপাত্র রুবাইয়াৎ ঠাকুর রবিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ আয়োজনে অংশ নিতে সাড়ে সাতটায় ফরিদপুর পৌঁছাই। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পরেই জানতে পারি সেখানে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। আমরা তখন গেস্ট হাউসেই ছিলাম। রাত সাড়ে ১০টায় বিশৃঙ্খলা চরম আকার ধারণ করলে অনুষ্ঠান বাতিলের কথা আমাদের জানানো হয়। এরপর ঢাকায় চলে আসি।’

পাশাপাশি, অনুসন্ধানে ফরিদপুর জেলা পুলিশের ফেসবুক পেজেও এ বিষয়ে প্রচারিত একটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টে বলা হয়, অনুষ্ঠানের সমাপনী দিনে জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী জেমসের কনসার্ট দেখতে আসা প্রায় ৮,০০০-১০,০০০ অনিবন্ধিত বহিরাগত দর্শক দেয়াল টপকে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। তারা ভেতরে ঢুকতে ব্যর্থ হয়ে মঞ্চ লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে, যার ফলে জিলা স্কুলের শিক্ষার্থী এবং বহিরাগতদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। সার্বিক নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ বিবেচনায় রাত ৯:৫০ মিনিটে অনুষ্ঠানটি স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

এছাড়াও, এ বিষয়ে রাজীব আহমদ নামের এক সাংবাদিকের ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টে তিনি বলেন, ‘..ফ‌রিদপু‌রের ঘটনা হল, জিলা স্কু‌লের সা‌বেক ও বর্তমান ‌নিব‌ন্ধিত শিক্ষার্থী‌দের কনসা‌র্টে ঢুক‌তে চে‌য়ে‌ছি‌লেন স্থানীয় ক‌য়েক হাজার জেমস ভক্তরা। অনিব‌ন্ধিত এই ব‌্যক্তি‌দের জন‌্য মা‌ঠের বাইরে বড় স্ক্রিন দেওয়া হ‌লেও, তারা সন্তুষ্ট হননি। মা‌ঠে ইটপাট‌কেল মা‌রেন। দেয়াল টপ‌কে ঢুক‌তে চাইলে মা‌ঠে থাকা সা‌বেক ও বর্তমান ছাত্ররা তা‌দের‌কে মা‌রে। এখা‌নে তৌ‌হি‌দি জনতার কো‌নো এঙ্গেলই নাই। কেউ কনসার্ট বন্ধ কর‌তে যায়‌নি।‌ জেমস ভক্ত‌দের মারামা‌রি‌তে ঘটনা ঘ‌টে‌ছে। কেউ নি/হত হয়‌নি। আর জেম‌সের প্রাণ পা‌লি‌য়ে বাঁচার দা‌বি‌টিই ভুয়া, কারণ যখন ঘটনা ঘ‌টে‌ছে তখন জেমস কনসার্টস্থ‌লেই যান‌নি। তি‌নি ও তার ব‌্যান্ড সা‌র্কিট হাউজে ছিল। আর কনসার্টস্থ‌লে র‌্যা‌ফেল ড্র চল‌ছিল।..’

অর্থাৎ, কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রেই ফরিদপুরে জেমসের কনসার্টটি ধর্মীয় কারণে বন্ধ করতে ইসলামপন্থী উগ্রপন্থীরা হামলা করেছেন শীর্ষক দাবির সপক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সুতরাং, ধর্মীয় কারণে ফরিদপুরে জেমসের কনসার্ট বন্ধ করতে ইসলামপন্থী উগ্রপন্থীরা হামলা করেছেন শীর্ষক দাবিটি বিভ্রান্তিকর।

তথ্যসূত্র

Share: