কারিনা কায়সারের মৃত্যু নিয়ে ফেসবুকে সংগঠিত অপপ্রচার

জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় কায়সার হামিদের মেয়ে ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারিনা কায়সার ভারতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (১৬ মে) রাতে মারা গেছেন। এর আগে ফুসফুসের জটিলতা ও লিভারের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১১ মে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ভারতের চেন্নাইতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অন্তত ০৯ মে কারিনাকে নিয়ে অনলাইন মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হতে দেখা যায়। সেদিন তার লাইফ সাপোর্টে থাকার খবর আসার পর একাধিক ফেসবুক পোস্টে বলা হয়, “গণভবনে লুটপাট কারী এই কারিনা কায়সার আর তার মা। অথচ এই মেয়ে আপার সাথেও দেখা করে এসেছিল, কথা বলে এসেছিল একটা প্রোগ্রামে। সামান্য কয়টা ডলারের লোভে জুলাই সন্ত্রাসীদের সাথে আন্দোলনে যোগদান করে। তারপর ৫ আগস্ট গণভবনে লুটপাট চালায়। দেশদ্রোহী, লুটপাটকারী, চিটার এরা।” যদিও কারিনা তার ফেসবুক পেজে ২০২৪ সালের ০৬ আগস্ট একটি ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, তিনি বা তার মা গণভবন থেকে কিছুই চুরি করেননি। এগুলো তাদেরই জিনিস ছিল। মূলত তার মায়ের নিজের কিছু জিনিসই ভিডিওতে তার মা দেখান এবং বলেন যে এগুলো গণভবন থেকে আনা হয়েছে। এই আইডিয়াটি কারিনারই ছিল বলে কারিনা তার ভিডিওতে দাবি করেন।


কারিনার মৃত্যুর পরও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থামেনি, বরং এই ইস্যুতে অপতথ্যও ডানা মেলেছে। ‘GojobVision’ নামের একটি সার্কাজম পেজ থেকে দাবি করা হচ্ছে, “গণভবনের জিনিসপত্র চুরি করা আমার ভুল হইছে, আমাকে ক্ষমা করে দিন।” শীর্ষক মন্তব্য করেছেন কারিনার বাবা কায়সার হামিদ। এই পোস্ট শেয়ার হচ্ছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে।

কায়সার হামিদ তার ফেসবুক প্রোফাইলে এক পোস্টে জানান, “আমার মেয়ের কোন ভূল ত্রুটি হয়ে থাকলে কিংবা কাউকে কস্ট দিয়ে থাকলে আপনারা তাকে ক্ষমা করে দিবেন।” এই পোস্টের কোথাও গণভবনের নামই উল্লেখ ছিল না।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সার্কাজম পেজগুলো অপতথ্য প্রচারের ধরণে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে৷ পেজের পরিচিতি অংশে স্যাটায়ার বা প্যারোডি উল্লেখ রেখে সমসাময়িক নানা ইস্যুতে সংশ্লিষ্টদের নামে ভুয়া মন্তব্য, সম্পাদিত ছবি কিংবা ভিত্তিহীন দাবি প্রচার করে এসব পেজ ক্রমাগত মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলছে। কারিনার মৃত্যুর পর পেজগুলো একই পথে হেঁটেছে।

Raju Ahmed নামের একটি প্রোফাইল থেকে একটি ফটোকার্ডের মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ কারিনার মৃত্যুতে “আজ ভারতে না গেলে কারিনা কায়সার বেঁচে থাকতো। ভারত ভুল চিকিৎসা দিয়ে কারিনাকে মেরে ফেলছে।” শীর্ষক মন্তব্য করেছেন। অথচ ফুয়াদ তার ফেসবুক পেজে কারিনার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করলেও আলোচিত এই মন্তব্যটি করেননি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, দাবিটির সূত্রপাত ‘Gupto Television’ নামের একটি সার্কাজম পেজ। ‘দৈনিক মোল্লার দেশ’ নামের আরেকটি সার্কাজম পেজ থেকে প্রায় সমজাতীয় একটি মন্তব্য চালিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রবাসী একটিভিস্ট ইলিয়াস হোসেনের নামে। এই পোস্টটিও আওয়ামী পন্থী গ্রুপগুলোয় শেয়ার হচ্ছে ইলিয়াসকে ‘পাকিস্তানি রাজাকার’ আখ্যা দিয়ে। ইলিয়াসের নামে প্রচার হওয়া এই ভুয়া মন্তব্যটি প্রচার হয়েছে ‘GojobVision’ পেজ থেকেও, যেটি যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশের প্রবাসী সাংবাদিক দস্তগীর জাহাঙ্গীর শেয়ার করেছেন।

একই ভুয়া মন্তব্য প্রচার করেছে ‘The Daily Trinomul – দৈনিক তৃণমূল’ নামের একটি ফেসবুক পেজও। এই পেজটিও এমন ভুয়া মন্তব্য প্রচারের জন্য চিহ্নিত। সার্কাজম বা প্যারোডি সংক্রান্ত কোনো ডিসক্লেইমার না দিয়েই নিয়মিতভাবে রাজনীতিবিদসহ নানা পরিচিত মুখকে জড়িয়ে ভুয়া মন্তব্য প্রচার করে আসছে পেজটি৷ এই পেজে গতকাল থেকে আজ বিকেল পর্যন্ত অন্তত ছয়টি ভুয়া মন্তব্য প্রচার করা হয়েছে, এসবে জড়ানো হয়েছে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান, সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, ডা. তাসনিম জারা, এনসিপি নেতা নুরুজ্জামান কাফি, ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরকে

‘Daily Mollar Desh’ নামের একটি সার্কাজম পেজ গতকাল প্রচার করে, সংসদের নারী আসনের সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু বলেছেন, “কারিনা কায়সারের মৃত্যুর কাছে টিকার অভাবে শত শত শিশু মৃত্যু কিছুই না। কারিনা আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতার একজন বীর জুলাইযোদ্ধা, তার অবস্থান অনেক উপরে।” যা একইভাবে আওয়ামী সমর্থিত গ্রুপগুলোতে প্রচার করা হয়। আদতে ডা. মিতু গতকাল কারিনাকে নিয়ে যে পোস্ট করেছেন তাতে এমন কিছুই উল্লেখ নেই।

কারিনার লাইফ সাপোর্টে থাকার খবর আসার পর গত ১০ মে মিতু ফেসবুকে তার ও কারিনার একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন। সেই ছবিও ‘Mehedi Hasan’ নামের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে সম্পাদনা করে বিকৃত করা হয়েছে গতকাল।

কারিনার মৃত্যুতে গণমাধ্যমের ফটোকার্ডকে সম্পাদনা করে অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাকের দুইটি ফটোকার্ড (, ) সম্পাদনা করে চিত্রনায়িকা প্রার্থনা ফারদিন দীঘি ও টেলিভিশন উপস্থাপিকা দীপ্তি চৌধুরীর নামে ভুয়া মন্তব্য প্রচার করা হয়েছে।

বাংলাদেশে নানা ইস্যুতে কবি, গীতিকার ও অভিনেতা মারজুক রাসেলকে জড়িয়ে নিয়মিতই ভুয়া মন্তব্যের প্রচার দেখা যায়। কারিনার মৃত্যুতেও এমন একটি ভুয়া মন্তব্য ছড়িয়েছে ফেসবুকে, যাতে দাবি করা হয়, মারজুক রাসেল বলেছেন, “হামে ৫০০+ নিষ্পাপ শিশু মারা গেলো, কারো কোন বিকার দেখলাম না, অথচ এখন শোকের বন্যা! তুমাগো মানবতা এত সিলেক্টিভ কেন?” অথচ তিনি এমন কোনো মন্তব্যই করেননি।

কারিনা কায়সারের অসুস্থতা ও মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন সার্কাজম ও তথাকথিত প্যারোডি পেজ-প্রোফাইল থেকে ভুয়া মন্তব্য, সম্পাদিত ছবি ও মনগড়া দাবি প্রচার করে ঘটনাটিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। একইসঙ্গে গণমাধ্যমের আসল ফটোকার্ড বিকৃত করে এবং বিভিন্ন পরিচিত ব্যক্তির নামে ভিত্তিহীন মন্তব্য জুড়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। এই ইস্যুতে অন্তত ১৩টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, আলোচিত দাবিগুলোর সঙ্গে প্রকৃত বক্তব্য বা বাস্তব ঘটনার মিল নেই; বরং পরিকল্পিতভাবে বিকৃত তথ্য ছড়িয়ে অনলাইন বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে।

Share: