গত ৩১ ডিসেম্বর শরীয়তপুরের ডামুড্যায় খোকন চন্দ্র দাস নামের একজন ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টা করা হয়। সেদিন রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে ছুরিকাঘাতের শিকার হন তিনি। হামলাকারীদের চিনে ফেললে তার শরীরে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করেন। মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসার জন্যে তাকে ঢাকা নেওয়া হলে ২ দিন পর গত ৩ জানুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। এর প্রেক্ষিতে খোকন দাসের স্ত্রীর বক্তব্য দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়।
প্রচারিত ভিডিওটিতে খোকন দাসের স্ত্রী সাদৃশ্য এক নারীকে বলতে শোনা যায়, “আমি শরীয়তপুরের কোকন দাসের স্ত্রী। প্রিয় বিশ্ববাসী, কিছুদিন আগে দিপু দাসের সাথে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার পূর্ণ আবৃত্তি আমরা আবার দেখতে পেলাম। আমার স্বামীকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যাওয়ার সময় চিনতে পারায়, শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করেছে। সনাতনীরা এভাবে নির্যাতনের শিকার হবে আর কত? আমরা এর প্রতিবাদ জানাই। যদি কঠোর দৃশ্যমান বিচার না হয়, এই নিপীড়ন কখনো বন্ধ হবে না।”

ফেসবুকে প্রচারিত এমন ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, খোকন দাসের স্ত্রীর বক্তব্য দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি আসল নয়। প্রকৃতপক্ষে, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে আলোচিত ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানের শুরুতে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি পর্যালোচনা করে দেখে রিউমর স্ক্যানার। পর্যালোচনায় ভিডিওটিতে বেশকিছু এআইজনিত অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়। ভিডিওজুড়ে কয়েক দফা অস্বাভাবিক কাট লক্ষ্য করা যায়। পাশাপাশি, ভিডিওটির শুরুতে পেছনে অবস্থানরত কয়েকজন নারীকে চিৎকারের ভঙ্গি করতে দেখা গেলেও ভিডিওটিতে তাদের কোনো শব্দ শোনা যায়নি। এছাড়া, খোকন দাসের স্ত্রীর বক্তব্যেও বেশ কিছু অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হয়। যেমন, তিনি খোকন দাসের নাম উচ্চারণ করেছেন ‘কোকন দাস’ হিসেবে এবং ‘পুনরাবৃত্তি’ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন ‘পূর্ণ আবৃত্তি’। পাশাপাশি, তার চোখের পানি পড়ার দৃশ্যেও স্বাভাবিকতার সঙ্গে অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়।
পরবর্তীতে ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় নির্মিত কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম ডিপফেক-ও-মিটারে আলোচিত ভিডিওটি পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ১০০ শতাংশ। এছাড়াও আরেক এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম হাইভ ডিটেক্টে ভিডিওটি যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটিতে শুনতে পাওয়া বক্তব্যটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯.৯ শতাংশ এবং ব্যবহৃত মিউজিকটির ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা ৯৯.১ শতাংশ।
খোকন দাসের স্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যম প্রথম আলোর ফেসবুক পেজে উক্ত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রচারিত একটি ভিডিও প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে খোকন দাসের স্ত্রীকে একই পোশাকে এবং আলোচিত ভিডিওটির সঙ্গে প্রায় একই ধরনের স্থানে ধারণ করা একটি ফুটেজ দেখতে পাওয়া যায়। তবে ভিডিওটিতে তাকে আলোচিত মন্তব্যের পরিবর্তে বলতে শোনা যায় “আজকে চারটা দিন হইয়া গেল। ওটারে ঝুলাইয়া আগুন দিয়া আমার সামনে পড়বে। যে পুড়লে কেমন লাগে? আমার স্বামী কি দাপান দাপাইছে। আমার স্বামীর সব রক্ত পইরা গেছে।” পাশাপাশি এখানে তার হাতে আলোচিত ভিডিওটির মত কোনো মাইক্রোফোন হাতে দেখতে পাওয়া যায়না।

উক্ত ভিডিও ব্যতীত আলোচিত বক্তব্য সংবলিত তার কোনো ভিডিও নির্ভরযোগ্য কোনো মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সুতরাং, শরীয়তপুরে নিহত খোকন দাসের স্ত্রীর বক্তব্য দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি
তথ্যসূত্র
- Prothom Alo Facebook Post
- Rumor Scanner’s Analysis


