মাগুরায় কেবল হিন্দুদের বৃত্তি দেওয়ার দাবিটি বিভ্রান্তিকর 

সম্প্রতি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ৩২ জন শিক্ষার্থীর একটি তালিকা প্রচার করে ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে, ‘মাগুরা ২ আসনের সংসদ সদস্য নিতাই রায় চৌধুরী ৩২ জন শিক্ষার্থীকে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের উপবৃত্তির টাকা দিয়েছে, এবং এই ৩২ জনই হিন্দু; একজন যবন মুসলমানকেও বৃত্তি দেওয়া হয়নি। ইন্টারনেটে দেখতে পেলাম এই এলাকার ৮৫% মুসলমান। বিএনপি করা, অনেকটা মধ্যপন্থী হিন্দু নেতারই এই অবস্থা। চিন্তা করুন আরএসএস শাসিত ভারতে মুসলমানেরা কিসের মধ্যে আছে! ১৯৪৭ এর আগে হিন্দু জমিদারের অধীনে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের কি অবস্থা ছিল তাও এখান থেকে আন্দাজ করা যায়। – মীর সালমান’

এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন Amjad Hossen Hridoy (আর্কাইভ), চবিয়ান (আর্কাইভ), Ebadul Haque Abad (আর্কাইভ)।

একই দাবিতে পোস্ট করে DU Insiders নামে একটি ফেসবুক পেজও। 

এরূপ দাবিতে ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, মাগুরায় কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বৃত্তি দেওয়া হয়েছে শীর্ষক দাবির প্রেক্ষাপট সঠিক নয়৷ প্রকৃতপক্ষে, এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাস্তবায়নাধীন ‘বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)’ শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে সমতলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির তালিকা। এতে মূলত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেওয়া হয়েছে এবং এসব নৃগোষ্ঠী শিক্ষার্থীরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তবে এক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তে নৃগোষ্ঠী পরিচয়ই মূলত বিবেচনা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত তালিকাটি পর্যবেক্ষণ করলে এর উপরের অংশে ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে বাস্তবায়নাধীন “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)” শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের উপজেলা ভিত্তিক বিভাজন ও বরাদ্দের প্রেক্ষিতে উপকারভোগী’ লেখা দেখা যায়। এরই সূত্র ধরে অনুসন্ধানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক সায়মা আক্তারের স্বাক্ষরিত গত ১ এপ্রিলের একটি বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়। বিজ্ঞপ্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে বাস্তবায়নাধীন ‘বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)’ শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জন্য প্রস্তাব আহ্বান করা হয়। বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, এক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত দেশের অন্যান্য এলাকায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর গরীব, দুঃস্থ, অসহায় ব্যক্তি/বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, এতিম বাস্তুভিটাহীন পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। উপকারভোগীদের বসতঘর নির্মাণ, বাইসাইকেল ও সেলাই মেশিন বিতরণ এবং শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করা হয়।

এছাড়া, প্রচারিত তালিকায় থাকা শিক্ষার্থীদের নাম পর্যবেক্ষণ করলে অনেকের নামের শেষে ‘রায়’, ‘বিশ্বাস’ এমন পদবি দেখা যায়। মূলত এমন পদবীর সূত্রেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বৃত্তি দেওয়া হয়েছে শীর্ষক আলোচিত দাবি প্রচার করা হয়েছে। পরবর্তীতে মাগুরায় থাকা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নামের পদবি/বংশাবলিতে হিন্দু নাম থাকার বিষয়ে অনুসন্ধানে গত ২১ জানুয়ারিতে জাতীয় দৈনিক ‘খবরের কাগজ’ এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, মাগুরায় বাগদী হিন্দু আদিবাসী সম্প্রদায় বসবাস করে থাকেন। পাশাপাশি, প্রতিবেদনে বাগদী সম্প্রদায়ের সভাপতি হীরোলাল, সাধারণ সম্পাদক সুবোধ বিশ্বাস ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তপন দে এমন হিন্দু নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়াও, ২০২২ সালের ৯ আগস্টে আরেক জাতীয় দৈনিক ‘প্রতিদিনের সংবাদ’ এর ওয়েবসাইটে ‘মাগুরায় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত’ শিরোনামে প্রচারিত এক প্রতিবেদনে পাওয়া যায়, মাগুরা জেলা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সমন্বয় পরিষদের আহবায়ক সুবোধ বাগদি, সদস্য সচিব শিশির রায়, উপাধ্যক্ষ উত্তম কুমার বিশ্বাস, আদিবাসী যুব কল্যাণ সমিতির সভাপতি মন্টু বিশ্বাস। অর্থাৎ, এ থেকে বুঝা যায় যে, মাগুরায় বসবাস করা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মানুষদের নামের শেষেও রায়, বিশ্বাস এর মতো পদবি থাকে।

এছাড়াও, অনুসন্ধানে ‘উপজেলা প্রশাসন শালিখা মাগুরা’র ফেসবুক পেজে গত ১১ জুলাইয়ে এ বিষয়ে প্রচারিত একটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টে সকলের জ্ঞাতার্থে জানানো হয়, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে বাস্তবায়নাধীন “বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা” শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের শিক্ষা বৃত্তি, সেলাই মেশিন, সাইকেল ও ঘর দেওয়া হয়। এ প্রকল্পের আওতায় শালিখা উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদেরও নিয়মিত সহায়তা দেয়া হয় এবং এবারও প্রাথমিক স্কুলের ৩২ জন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়মিত দাপ্তরিক কাজের অংশ। এসকল শিক্ষার্থী বাছাই নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছেন। সবাইকে সঠিক তথ্য শেয়ার করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’

উক্ত পোস্টটির মন্তব্য বিভাগে ‘মুহাম্মদ আতিক’ নামের একজনের সবাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসার জবাবে উপজেলা প্রশাসনটির ফেসবুক পেজ থেকে এক রিপ্লাইয়ে বলা হয়, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে দেয়া হয়েছে। তাদের ধর্ম আমাদের বিবেচনার নয়।’

পাশাপাশি, মাগুরার সাংবাদিক ‘Pankaj Roy’ এর ফেসবুক অ্যাকাউন্টেও এ বিষয়ে প্রচারিত একটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টে পংকজ রায় আলোচিত তালিকার সংযুক্তিসহ বলেন, ‘এখানে শালিখার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের কাছ থেকে তালিকা সংগ্রহ করেছিল শালিখা উপজেলা প্রশাসন এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল থেকে সংখ্যালঘু অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের উপবৃত্তি বা যে কোনো ধরনের প্রণোদনা নতুন কিছু নয়। এটা চলমান প্রায় বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তারই ধারাবাহিকতায় উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে তালিকা সম্পাদন ও বিতরণ হয়ে থাকে। তবে মাননীয় সংস্কৃতি মন্ত্রী ও মাগুরা ২ আসনের এমপি এ্যাডঃ নিতাই রায় চৌধুরী কে জড়িয়ে যে অপপ্রচার ও সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক তথ্য ভাইরাল করা হচ্ছে এটা স্বভাবতই নিন্দনীয় ও মানহানিকর।..’

এছাড়াও, সংবাদমাধ্যম ‘আজকের পত্রিকা’র ওয়েবসাইটে গত ১১ জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হাসান চৌধুরীর মন্তব্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তালিকাটি মূলত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির তালিকা। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে শুধু তাদের নামই থাকবে। এটা শুধু শালিখাতে নয়, দেশের সব উপজেলাতেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত শিক্ষার্থীরা এই বিশেষ উপবৃত্তি পেয়ে থাকে।’ ইউএনও আরও বলেন, ‘এই বিশেষ তহবিলের আওতায় মোট ১০৪ জনের জন্য টাকা এসেছিল। ফেসবুকে যে তালিকাটি ছড়িয়েছে তাতে ৩২ জনের নাম দেখা গেলেও, মূল তালিকায় মোট ৬৪ জন শিক্ষার্থীর নাম রয়েছে। বাকি ৪০ জনের টাকা (উপযুক্ত শিক্ষার্থী না থাকায়) নিয়মানুযায়ী সরকারি কোষাগারে ফেরত গেছে।’

এছাড়া, প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের নানা জায়গায় এ কর্মসূচির আওতায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সহায়তায় পাওয়ার বিষয়ে সংবাদ পাওয়া যায়। এছাড়াও, বর্তমান বিএনপি সরকারের আগে থেকেই এই কর্মসূচির আওতায় দেশের নানা জায়গায় ইতোপূর্বে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সহায়তায় পাওয়ার বিষয়ে সংবাদ পাওয়া যায়।

প্রসঙ্গত, সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা’র এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের একমাত্র মুসলিম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ‘পাঙ্গাল’৷ তারা মৌলভীবাজার ও সিলেটে বসবাস করে থাকেন। ধর্মীয় ভাবে মুসলিম হলেও সাংস্কৃতিক ভাবে মণিপুরিদের সাথে তাদের মিল বেশি। অর্থাৎ, এ হিসেবে মাগুরায় কোনো মুসলিম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নেই৷ তাই এ তালিকায় মুসলিম থাকাটাও অবাস্তব।

সুতরাং, মাগুরায় কেবলমাত্র হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বৃত্তি দেওয়া হয়েছে শীর্ষক দাবি বিভ্রান্তিকর।

তথ্যসূত্র

Share: