ফেসবুকে এক প্রোফাইল থেকেই রাজনৈতিক দল ও নেতাদের জড়িয়ে একাধিক গণমাধ্যমের সম্পাদিত ফটোকার্ড প্রচার

সম্প্রতি ফেসবুকে Mehedi Hasan নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতাদের জড়িয়ে একাধিক গণমাধ্যমের আদলে ছয়টি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়েছে।

আরটিভি’র নামে প্রচারিত ফটোকার্ডে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে প্রাণ গেল এনসিপি কর্মীর।’

প্রথম আলো’র নামে প্রচারিত ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, ‘সালাহউদ্দিন আহমদের পেশা আইন ও শিলং মদ, বছরে আয় ৬ কোটি।’

বাংলাদেশ টাইমসের নামে প্রচারিত ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, ‘খালেদা জিয়া ক/ব/র থেকেও নির্বাচন করে পারে —প্রিন্স।’

কালের কণ্ঠের নামে প্রচারিত ফটোকার্ডে বলা হয়েছে, ‘এক কাপ চায়ের টাকাও আমি দুর্নীতি করিনি, গাড়ি ফ্লাট ব্যাংক ব্যালেন্স সব আমার বাবার, দাদা জমিদার ছিলঃ হাসনাত।’

সময় টিভির নামে প্রচারিত ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ‘সামান্তা শারমিনের পেশা ইমো ফ্রিল্যান্সিং, ঘণ্টায় আয় ৫০০ টাকা।’

চ্যানেল২৪ এর নামে প্রচারিত ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ‘বিকাশে টাকা পাঠানো ব্যক্তিদের ভীড় তাসনীম জারার বাড়িতে।’

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ফেসবুকে Mehedi Hasan নামের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো আরটিভি, প্রথম আলো, বাংলাদেশ টাইমস, কালের কণ্ঠ, সময় টিভি ও চ্যানেল২৪ প্রকাশ করেনি। প্রকৃতপক্ষে, গণমাধ্যমগুলোর ফটোকার্ড ডিজাইন প্রযুক্তির সহায়তায় নকল করে আলোচিত দাবি সংবলিত ফটোকার্ডগুলো তৈরি করা হয়েছে।

আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো পৃথকভাবে যাচাই করেছে রিউমর স্ক্যানার।

ফটোকার্ড যাচাই – ১

ফটোকার্ডটিতে থাকা আরটিভির লোগো ও প্রকাশের তারিখের (০২ জানুয়ারি) সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করে ০২ জানুয়ারি এরূপ কোনো ফটোকার্ডের সন্ধান মেলেনি। এমনকি আরটিভির ওয়েবসাইটেও আলোচিত দাবি সমর্থিত সংবাদ পাওয়া যায়নি। তবে একইদিনে আরটিভির ফেসবুক পেজে একই ছবি সত একটি ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত ফটোকার্ডটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আলোচিত ফটোকার্ডের সাথে উক্ত ফটোকার্ডের শিরোনাম ব্যতিত বাকি সকল উপাদানের মিল রয়েছে। আরটিভির মূল ফটোকার্ডে ‘ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে প্রাণ গেল চোরের’ শীর্ষক বাক্য থাকলেও প্রচারিত ফটোকার্ডটিতে এর পরিবর্তে আলোচিত বাক্যটি লেখা হয়েছে।

অর্থাৎ, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনার মাধ্যমে আরটিভির এই ফটোকার্ডটি সম্পাদনা করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।

মূল ফটোকার্ড সংবলিত আরটিভির পোস্টের মন্তব্যের ঘরে গণমাধ্যমটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও আলোচিত দাবি সংক্রান্ত কোনো তথ্য উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

ফটোকার্ড যাচাই – ২

আলোচিত ফটোকার্ডে থাকা প্রথম আলোর লোগো ও প্রকাশের তারিখের সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে ০২ জানুয়ারি প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো পর্যালোচনা করে উক্ত শিরোনাম সংবলিত কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রথম আলোর ওয়েবসাইটেও আলোচিত দাবি সমর্থিত কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে একইদিনে প্রথম আলোর ফেসবুক পেজে একই ছবি সংবলিত একটি ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত ফটোকার্ডটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আলোচিত ফটোকার্ডের সাথে উক্ত ফটোকার্ডের শিরোনাম ব্যতিত বাকি সকল উপাদানের মিল রয়েছে। প্রথম আলোর মূল ফটোকার্ডে ‘সালাহউদ্দিন আহমদের পেশা আইন ও ব্যবসা, বছরে আয় ৬ কোটি’ শীর্ষক বাক্য থাকলেও প্রচারিত ফটোকার্ডটিতে এর পরিবর্তে আলোচিত বাক্যটি লেখা হয়েছে।

অর্থাৎ, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনার মাধ্যমে প্রথম আলোর এই ফটোকার্ডটি সম্পাদনা করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।

মূল ফটোকার্ড সংবলিত প্রথম আলোর পোস্টের মন্তব্যের ঘরে গণমাধ্যমটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও আলোচিত দাবি সংক্রান্ত কোনো তথ্য উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

ফটোকার্ড যাচাই – ৩

ফটোকার্ডটিতে থাকা বাংলাদেশ টাইমসের লোগো ও প্রকাশের তারিখের সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করে ০১ জানুয়ারি এরূপ কোনো ফটোকার্ডের সন্ধান মেলেনি। এমনকি বাংলাদেশ টাইমসের ওয়েবসাইটেও আলোচিত দাবি সমর্থিত সংবাদ পাওয়া যায়নি। তবে একইদিনে বাংলাদেশ টাইমসের ফেসবুক পেজে একই ছবি সংবলিত একটি ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত ফটোকার্ডটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আলোচিত ফটোকার্ডের সাথে উক্ত ফটোকার্ডের শিরোনাম ব্যতিত বাকি সকল উপাদানের মিল রয়েছে। বাংলাদেশ টাইমসের মূল ফটোকার্ডে ‘খালেদা জিয়া ক/ব/র থেকেও জাতিকে নেতৃত্ব দেবেন —প্রিন্স’ শীর্ষক বাক্য থাকলেও প্রচারিত ফটোকার্ডটিতে এর পরিবর্তে আলোচিত বাক্যটি লেখা হয়েছে।

অর্থাৎ, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনার মাধ্যমে বাংলাদেশ টাইমসের এই ফটোকার্ডটি সম্পাদনা করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।

মূল ফটোকার্ড সংবলিত বাংলাদেশ টাইমসের পোস্টের মন্তব্যের ঘরে গণমাধ্যমটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও আলোচিত দাবি সংক্রান্ত কোনো তথ্য উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

ফটোকার্ড যাচাই – ৪

ফটোকার্ডটিতে থাকা কালের কণ্ঠের লোগো ও প্রকাশের তারিখের সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করে ০২ জানুয়ারি এরূপ কোনো ফটোকার্ডের সন্ধান মেলেনি। এমনকি কালের কণ্ঠের ওয়েবসাইটেও আলোচিত দাবি সমর্থিত সংবাদ পাওয়া যায়নি। তবে একইদিনে কালের কণ্ঠের ফেসবুক পেজে একই ছবি সংবলিত একটি ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত ফটোকার্ডটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আলোচিত ফটোকার্ডের সাথে উক্ত ফটোকার্ডের শিরোনাম ব্যতিত বাকি সকল উপাদানের মিল রয়েছে। কালের কণ্ঠের মূল ফটোকার্ডে ‘এক কাপ চায়ের টাকাও আমি দুর্নীতি করিনিঃ হাসনাত আব্দুল্লাহ’ শীর্ষক বাক্য থাকলেও প্রচারিত ফটোকার্ডটিতে এর পরিবর্তে আলোচিত বাক্যটি লেখা হয়েছে।

অর্থাৎ, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনার মাধ্যমে কালের কণ্ঠের এই ফটোকার্ডটি সম্পাদনা করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।

মূল ফটোকার্ড সংবলিত কালের কণ্ঠের পোস্টের মন্তব্যের ঘরে গণমাধ্যমটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও আলোচিত দাবি সংক্রান্ত কোনো তথ্য উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

ফটোকার্ড যাচাই – ৫

আলোচিত ফটোকার্ডে থাকা সময় টিভির লোগো ও প্রকাশের তারিখের (১ জানুয়ারি) সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট পর্যবেক্ষণ করে এমন কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে ‘Gorom TV’ নামক একটি ফেসবুক পেজে গত ০১ জানুয়ারি প্রকাশিত এ সংক্রান্ত মূল ফটোকার্ডটি খুঁজে পাওয়া যায়।

‘Gorom TV’ পেজটির পরিচিতি অংশ থেকে জানা যায়, এই পেজটি ব্যঙ্গ ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে পরিচালনা করা হয়। এটি কোনো বাস্তব বা প্রকৃত খবরের পেজ নয়।

অর্থাৎ, একটি স্যাটায়ার পেজের ব্যাঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে সূত্রপাত হওয়া তথ্যকে আসল তথ্য হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।

ফটোকার্ড যাচাই – ৬

আলোচিত ফটোকার্ডে থাকা চ্যানেল২৪ এর লোগো ও প্রকাশের তারিখের সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে ০৩ জানুয়ারি প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো পর্যালোচনা করে উক্ত শিরোনাম সংবলিত কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। চ্যানেল২৪ এর ওয়েবসাইটেও আলোচিত দাবি সমর্থিত কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে ২০২৫ সালের ০৩ এপ্রিল তাসনিম জারার ফেসবুক প্রোফাইলে একই ছবি সংবলিত একটি পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়। পোস্টের ক্যাপশন থেকে জানা যায়, সে সময় ঈদ পালন করতে শ্বশুরবাড়ি রাজবাড়ী সদর উপজেলার ভান্ডারিয়াতে অবস্থান করছিলেন জারা। ছবিটি ওখানেই তোলা।

অর্থাৎ, ভিন্ন ঘটনার পুরোনো ছবি ব্যবহার করে ভুয়া দাবিটি প্রচার করা হয়েছে।

সুতরাং, ফেসবুকে এক প্রোফাইল থেকেই ছয়টি গণমাধ্যমের নামে প্রচারিত ছয়টি ফটোকার্ডের চারটি সম্পাদিত এবং দুইটি ভুয়া।

তথ্যসূত্র

Share: