গত মার্চে রমজানের সময় ইফতারের মুহুর্তে হঠাৎ জ্ঞান হারান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস। সেসময় তাকে এভারেকেয়ারে নেওয়া হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল টিম গঠন করে দ্রুত তার মতিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। পরবর্তীতে ১৫ মার্চ তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে টানা একমাসের চিকিৎসা শেষে চিকিৎসকদের পরামর্শে ফিজিও থেরাপির জন্য মির্জা আব্বাসকে মালয়েশিয়ার প্রিন্স কোর্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলে জানা যায়। র্দীঘ এই সময়ে মির্জা আব্বাসের শারীরিক অবস্থা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের অপতথ্য প্রচারিত হতে দেখা যায়। এরই মাঝে গত ৬ মে তার সহধর্মিণী আফরোজা আব্বাসের নামে পরিচালিত ফেসবুক পেজে তার দুটি ছবি প্রচার করা হয়। ছবিগুলোতে সহধর্মিণীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে মির্জা আব্বাসকে একটি হুইল চেয়ারে দেখতে পাওয়া যায়।
একই ছবিগুলো আব্বাস পরিবারের একাধিক সদস্যের ফেসবুকেও প্রচার করতে দেখা যায়। তবে উক্ত ছবিটি মির্জা আব্বাসের আসল কোনো ছবি নয়, বরং এআই জেনারেটেড ছবি দাবি করে ফেসবুকে কিছু পোস্ট প্রচারিত হতে দেখে রিউমর স্ক্যানার। এসব পোস্টের কয়েকটিতে একটি এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুলের স্ক্রিনশটও ব্যবহার করতে দেখা যায়। যেখানে ছবিটি ৭২ শতাংশ এআই জেনারেটেড হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।

ফেসবুকে প্রচারিত এমন পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, মির্জা আব্বাসের আলোচিত এই ছবিগুলো এআই জেনারেটেড নয়। প্রকৃতপক্ষে, ছবিগুলো আসল ও বাস্তব। পরিবারের সাথে তার এই ছবিগুলো মালয়েশিয়ার প্রিন্স কোর্ট হাসপাতালে ধারণ করা হয়েছে।
আলোচিত দাবিটির বিষয়ে অনুসন্ধানে প্রচারিত ছবিটি সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করে দেখে রিউমর স্ক্যানার। তবে রিউমর স্ক্যানারের পর্যালোচনায় ছবিটিতে কোনো প্রকার এআই জনিত অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়নি। পরবর্তীতে একই ছবিটি দেশের ফ্যাক্টচেকিং ইন্ডাস্ট্রিতে বহুল ব্যবহৃত ফ্রি এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম Hive Detect-এ পরীক্ষা করে দেখে রিউমর স্ক্যানার। সেখানে ছবিটি এআই দ্বারা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয় মাত্র ১.১ শতাংশ। তবে একই ছবিটি আরেক এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম Sight Engine-এ পরীক্ষা করে দেখা হলে, সেখানে ছবিটি এআই জেনারেটেড বা ডিপফেক নয় বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সেখানেও ১ শতাংশ ফেস ম্যানিপুলেশনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়।

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে মির্জা আব্বাসের ছোটো বোন শাহিদা মির্জার ছেলে আব্দুল্লাহ জামাল চৌধুরী আদিত্যের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিউমর স্ক্যানারকে জানান, আলোচিত এই ছবিগুলো এআই জেনারেটেড নয়, বরং আসল। এগুলো মালয়েশিয়ার প্রিন্স কোর্ট মেডিকেল সেন্টারে ধারণ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে রিউমর স্ক্যানারের পক্ষ থেকে মির্জা আব্বাসের বড় ছেলে মির্জা ইয়াসির আব্বাসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিউমর স্ক্যানারকে আলোচিত ছবিটির পাশাপাশি সেদিন ধারণ করা একাধিক ছবি সরবরাহ করেন। যা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, মির্জা আব্বাসের ছবিগুলো এআই জেনারেটেড নয়, বাস্তব ও আসল।
এছাড়াও পরবর্তীতে মির্জা আব্বাসের সহধর্মিণী আফরোজা আব্বাসের নামে পরিচালিত ফেসবুক পেজে গত ৮ মে মির্জা আব্বাসের আরও নতুন দুটি ছবি প্রচার করতে দেখা যায়। যেখানে তাদেরকে ভিন্ন পোশাকে দেখতে পাওয়া যায়। পাশাপাশি গত ৯ তারিখে একই পেজে আরেকটি ভিডিও প্রচার করতে দেখা যায়, যেখানে তাদের সাথে মির্জা আব্বাসের ভাই মির্জা খোকনকেও দেখতে পাওয়া যায়।

একই দিনে মির্জা আব্বাসের সাথে ভিডিও কলে কথা বলার মুহুর্তের স্ক্রিনশট নিজের প্রোফাইলে শেয়ার করেন তার ছোট বোন শাহিদা মির্জা। ভিডিও কলের স্ক্রিনশটেও মির্জা আব্বাসকে হাসপাতালের হুইল চেয়ারে দেখতে পাওয়া যায়।

প্রাপ্ত তথ্যগুলোর ভিত্তিতে এটা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে, মির্জা আব্বাসের আলোচিত ছবিগুলো এআই জেনারেটেড নয়। ছবিগুলো ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করে এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুলে যাচাই করায় এমন বিভ্রান্তিকর ফলাফল দেখায়।
মূলত, এআই শনাক্তকারী টুল সবসময় নির্ভুল ফল দেয় না। ছবির ক্ষেত্রেও এআই শনাক্তকারী টুল সবসময় সঠিক ফল দেয় না। অনেক সময় সম্পাদিত বা উচ্চমানের বাস্তব ছবিকেও ভুলভাবে এআই-তৈরি বলে শনাক্ত করা হতে পারে, আবার দক্ষভাবে তৈরি এআই ছবিকে বাস্তব ছবি হিসেবেও দেখাতে পারে। কারণ এসব টুল সাধারণত পিক্সেল প্যাটার্ন, আলো-ছায়া, টেক্সচার ও মেটাডেটা বিশ্লেষণ করে অনুমান করে। তাই ছবির ক্ষেত্রে এআই শনাক্তকরণের ফলকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, বরং সহায়ক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা উচিত। এজন্যে ছবির সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এসব টুলের ফলাফলের চেয়ে ছবিতে বিদ্যমান সূক্ষ্ম অসঙ্গতিগুলোতেও অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়ে থাকে।
বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্যে মির্জা আব্বাসের ছবিটি এআই জেনারেটেড দাবি করে Zubayer MD নামের যে অ্যাকাউন্টটি থেকে প্রথম পোস্ট করা হয় সেই ফেসবুক অ্যাকাউন্টের প্রোফাইলে ব্যবহৃত ছবিটি এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম Hive Detect এবং Sight Engine-এ যাচাই করলে দেখা যায়, উভয় টুলই ছবিটি এআই দ্বারা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা যথাক্রমে ০.২ এবং ১ শতাংশ বলে জানায়। এছাড়াও Hive Detect-এ ছবিটি ০.৪ শতাংশ ডিপফেক হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়। অপরদিকে Sight Engine-এ এই ছবিটিতেও ১ শতাংশ ফেস ম্যানিপুলেশন করা হয়ে থাকতে পারে বলে জানায়। সে হিসেবে মির্জা আব্বাসের ছবিকে এআই জেনারেটেড ছবি বলে দাবিকারীর নিজের ছবিটিও এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

সুতরাং, মির্জা আব্বাসের শারীরিক সুস্থতার খবর জানিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষে থেকে ফেসবুকে প্রচারিত ছবিটি এআই জেনারেটেড বলে যে দাবি করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।


