ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন শেহরীন আমিন ভূঁইয়া (মোনামী)। ২০২৪ সালের আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে পরবর্তী সময়ে এই দায়িত্বে এসেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের এই সহকারী অধ্যাপক। মোনামী আলোচনায় আসেন সে বছরের জুলাইয়ের শেষদিকে৷ ৩১ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে যোগদান করতে এসে পুলিশের হাতে আটক হওয়া থেকে শিক্ষার্থীকে বাঁচাতে গিয়ে পুলিশের ধাক্কায় পড়ে আহত হন শেহরীন আমিন ভূঁইয়া। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান সরকারের সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে কখনও প্রাসঙ্গিকভাবে, আবার অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রাসঙ্গিকভাবে শেহরীন আমিন ভূঁইয়াকে জড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া কনটেন্ট ছড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে গত বছরের সেপ্টেম্বরে ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে তাকে লক্ষ্য করে নিয়মিত অপতথ্য, বিকৃত তথ্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করে রিউমর স্ক্যানার। প্রশাসনিক পদ থেকে তার সরে দাঁড়ানোর পরও একই চিত্র আবার সামনে এসেছে—নতুন করে তাকে ঘিরে শুরু হয়েছে অপতথ্য, ট্রল ও ব্যক্তিগত আক্রমণের বিস্তার।
এবারের অপতথ্যের শুরুটা ফটোকার্ড সম্পাদনা দিয়ে৷ আরটিভি ও কালের কণ্ঠ ফটোকার্ডের মাধ্যমে প্রচার করে মোনামীর পদত্যাগের খবর। ফটোকার্ড দুইটি সম্পাদনা করে Mehedi Hasan নামের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে প্রচার করা হয় যথাক্রমে ‘ডাকসু নির্বাচনে শিবির কে সহযোগিতা করার জন্য প্রক্টরের দায়িত্ব নিয়েছিলাম আজ পদত্যাগ করলাম : মোনামি’ এবং ‘হামে আক্রান্ত হয়ে পদত্যাগ করলেন : মোনামি’ শীর্ষক দাবি।

মোনামীর হামে আক্রান্তের দাবি সংক্রান্ত কিছু পোস্ট অবশ্য মেহেদী হাসানের এই সম্পাদিত ফটোকার্ড প্রকাশের আগে থেকেই ছড়াচ্ছিল। এসব পোস্টের কয়েকটিতে মোনামীকে ‘নর্তকী’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে।
মোনামীর পদত্যাগ ইস্যুতে কিছু পোস্টে একটি ছবি প্রচার করা হচ্ছে। ছবিটিতে মোনামী দাবিতে একজন নারীকে একটি ঝুলন্ত কাঁচা মাংসের অংশের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। দুটির আকৃতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কাছাকাছি দেখানোর মাধ্যমে নারীর শরীর, বিশেষ করে নিতম্বের সঙ্গে মাংসের তুলনা করার একটি ভিজ্যুয়াল বার্তা তৈরি করা হয়েছে।
এই ছবিটি গত রাত থেকেই ফেসবুকে ছড়াচ্ছিল। রাত সাড়ে তিনটার কিছু আগে Aronno Abir নামের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে ছবিটি প্রথম পোস্ট করা হয়। সকালে মোনামীর পদত্যাগের খবর আসার পর একই প্রোফাইল থেকে ছবিটি শেয়ার করে ক্যাপশন লেখা হয়েছে, “রাতে পোস্ট দিয়ে ঘুমালাম৷ সকালে উঠে দেখি পদত্যাগ করছে ভাবি!”
ছবিটিতে মোনামীকে যে পোশাকে দেখা যাচ্ছে, সেই পোশাকে তার কোনো ছবি রিভার্স সার্চ করে এবং তার ফেসবুক প্রোফাইলে পাওয়া যায়নি। কাঁচা মাংসের ছবিটির অস্তিত্ব ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে আগে থেকেই বিদ্যমান৷ এআই টুলগুলো আলাদাভাবে এই ছবিকে এআই দিয়ে তৈরি বলে শনাক্ত করছে। এছাড়া, এআই শনাক্তকারী টুল হাইভ ডিটেক্ট জানাচ্ছে, মোনামী ও কাঁচা মাংসের অংশের ছবিটিও এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।

এই ছবি ছাড়াও আপত্তিকর নানা কনটেন্টে মোনামীকে নিয়ে দিনভর আলোচনা দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বসে ছিল না সার্কাজম পেজগুলোও। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে গজিয়ে ওঠা এসব পেজে সার্কাজম আকারে ভুয়া মন্তব্য, এডাল্ট কনটেন্টসহ নানা ধরণে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে ক্রমাগত। এসব কনটেন্ট ডাউনলোড হয়ে ছড়াচ্ছে বাস্তব দাবিতে। কখনো কখনো তা দায়িত্বশীলদের বক্তব্যেও চলে আসতে দেখা গেছে। মোনামীর পদত্যাগ ইস্যুতে তিনটি সার্কাজম পেজে (GojobVision, Gupto Tv, Gupto Television) অন্তত নয়টি (এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে) পোস্ট করা হয়েছে।

শেহরীন আমিন ভূঁইয়ার পদত্যাগকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ, নারীবিদ্বেষী ট্রল ও অপতথ্যের সমন্বিত বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। সম্পাদিত ফটোকার্ড, এআই দিয়ে তৈরি আপত্তিকর ছবি এবং সার্কাজমের আড়ালে প্রচারিত বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের মাধ্যমে একজন শিক্ষিকাকে পরিকল্পিতভাবে হেয় করার প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শভিত্তিক অনলাইন গোষ্ঠীগুলোর অংশগ্রহণে এ ধরনের অপপ্রচার শুধু ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে না, বরং জনপরিসরে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।


