শপিংয়ে মায়ের কোলে প্রচণ্ড গরমে ২ মাসের বাচ্চা মারা যাওয়ার তথ্যটি গুজব

সম্প্রতি ‘২ মাসের বাচ্চা নিয়ে মায়ের শপিং। প্রচন্ড গরমে মায়ের কোলেই বাচ্চার মৃত্যু। শপিংয়ের মনোযোগে বুঝতেই পারে নি “মা”।‘ শীর্ষক দাবিতে ভিন্ন ভিন্ন স্থানের নাম এবং ভিন্ন ভিন্ন নারী ও শিশুর ছবি উল্লেখ করে একটি তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে।

কুমিল্লার চান্দিনার ঘটনা দাবিতে এমন পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) ও এখানে (আর্কাইভ)।

কোনো স্থান উল্লেখ না করে উক্ত দাবিতে প্রচারিত এমন পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ)।

ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কের ঘটনা দাবিতে এমন পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রচণ্ড গরমে শপিংয়ে মায়ের কোলে দুই মাসের শিশুর মৃত্যুর দাবিতে প্রচারিত তথ্যটি সঠিক নয় বরং কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট তথ্যসূত্র ছাড়াই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে ভিন্ন ভিন্ন স্থানের নাম এবং ভিন্ন ভিন্ন নারী ও শিশুর ছবি ব্যবহার করে উক্ত তথ্যটি প্রচার করা হচ্ছে।

তথ্যটির সত্যতা যাচাইয়ে রিউমর স্ক্যানার টিম প্রথমে ফেসবুকে প্রচারিত দাবিটির তথ্যসূত্র জানার চেষ্টা করে।

এক্ষেত্রে পোস্টগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, পোস্টগুলোতে কোনো তথ্যসূত্রের উল্লেখ নেই। অর্থাৎ ঘটনাটি কোন মার্কেটে, কখন ঘটেছে, ঘটনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এমন কোনো তথ্য উক্ত পোস্টগুলো থেকে পাওয়া যায়নি। বিপরীতে একই দাবিতে রিউমর স্ক্যানার টিম অজ্ঞাত স্থান সহ দুইটি আলাদা আলাদা স্থানের নামের উল্লেখ পায়।

এর মধ্যে কোনো কোনো পোস্টে দাবি করা হয়, এই ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে, আবার কেউ কেউ বলছেন এই ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার চান্দিনায়। আবার কিছু পোস্টে এই ঘটনাটির কোনো স্থান উল্লেখ না করে কেবল তথ্যটিই প্রচার করা হচ্ছে।

দাবিটি নিয়ে আরও অধিকতর যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড অনুসন্ধানেও কোনো গণমাধ্যমে এমন কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে উক্ত দাবির বিপরীতে ফেসবুকে কুমিল্লার স্থানীয় সাংবাদিক ও বাসিন্দাদের পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়।

এ প্রসঙ্গে চান্দিনা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় দৈনিক যুগান্তরের চান্দিনা প্রতিনিধি মো. আব্দুল বাতেন লিখেন, ‘ফেসবুকে একটি মিথ্যা সংবাদের শিরোনাম পোস্ট করেছে। চান্দিনায় এ বছর এধরনের কোন ঘটনাই ঘটেনি, তবে গেল বছর রমজান মাসে ঘটেছিল এই ঘটনাটি, চান্দিনায় ২ মাসের বাচ্চা নিয়ে শপিংয়ে আসা মায়ের কোলে শিশুর মৃত্যু! তীব্র গরমে শিশুটির মৃত্যু ঘটেছে বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসক।

বাচ্চা নিয়ে শপিং। মায়ের কোলে বাচ্চা মরে আছে, নিজের কোলের শিশু মৃত্যুর অনেক পরে বুঝতে পেরেছে মা!! ) পোস্ট করে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন। এ নিয়ে নেটিজেনরা অনেক মন্তব্য করেছেন। যে সংবাদ সম্পূর্ণ মিথ্যা যা এই বছর ঘটেনি পূর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি পুনঃ প্রকাশ করেছেন কিছু কপি পেস্ট সাংবাদিকরা…।’

মুনীর সাঈদ নামে কুমিল্লার চান্দিনার স্থানীয় এক বাসিন্দা লিখেন, ‘চান্দিনা নিয়ে মহাগুজব! আজকে সারাদিন দেখলাম, চান্দিনায় নাকি কোন মহিলা শপিং করা অবস্থায় তার কোলে থাকা ২ মাসের বাচ্চা মারা গেছে! সে মহিলা টেরই পায়নি।

ভাইরে ভাই, আমি নিজেই কুমিল্লা জেলার চান্দিনার ছেলে। সারাদেশের চমকপ্রদ সংবাদগুলো সবার আগে পোস্ট করতে চেষ্টা করি। অথচ আমার এলাকায় এমন একটা ঘটনা ঘটে গেলো, অথচ আমিই জানলাম না, বিষয়টা কেমন হয়ে গেল না? হতে পারে, এই খবরটা আমার দৃষ্টিতে আসে নি। আমার ছোটভাই এখনো চান্দিনাতেই কর্মরত। তার নজরেও এমন খবর পড়েনি! এমনকি স্থানীয় সাংবাদিক ও প্রশাসনের কাছেও এমন তথ্য নেই। তাহলে ফেইসবুকের লাইক কমেন্ট ব্যবসায়ীরা এই তথ্য কোথায় পেলো? তবে এক সাংবাদিক লিখেছেন, এমন ঘটনা গত বছর ঘটে থাকতে পারে। কিন্তু এ বছর এ জাতীয় কোনো ঘটনাই ঘটেনি!…’

পাশাপাশি রিউমর স্ক্যানার টিমও তথ্যটির সত্যতা যাচাইয়ে বেসরকারি টিভি চ্যানেল এখন টিভির সিনিয়র রিপোর্টার ও কুমিল্লা ব্যুরো চীফ সাইফুল্লাহ খালিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তিনি কুমিল্লা চান্দিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বরাতে জানান, ঘটনাটি মিথ্যা। এছাড়া চান্দিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহাবুদ্দীন খাঁনের সঙ্গেও যোগাযোগ করে রিউমর স্ক্যানার টিম। তিনিও চান্দিনায় এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে নিশ্চিত করেছেন।

এছাড়া কোনো কোনো পোস্টে চান্দিনার ঘটনা দাবিতে প্রচারিত উক্ত তথ্যটির তথ্যসূত্র হিসেবে কুমিল্লা মেডিকেল সেন্টারকে (টাওয়ার হাসপাতাল) উদ্ধৃত করা হয়।

পরবর্তীতে রিউমর স্ক্যানার টিম থেকে কুমিল্লার টাওয়ার হাসপাতালেও যোগাযোগ করা হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেখানে গতকাল এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে রিউমর স্ক্যানারকে নিশ্চিত করে।

অপরদিকে অনুসন্ধানে যমুনা ফিউচার পার্কেও এমন কোনো ঘটনা ঘটার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। রিউমর স্ক্যানারের সার্বিক বিশ্লেষণে স্বাভাবিকভাবেই প্রতীয়মান হয় যে, রাজধানী ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কের মতো জনবহুল জায়গায় এমন কোনো ঘটনা ঘটলে সেটার সংবাদ গণমাধ্যম সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বিস্তারিত তথ্যসহ পাওয়া যেত।

উক্ত ঘটনার দাবিতে প্রচারিত ছবির সত্যতা যাচাই

দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, উক্ত ঘটনার ছবি দাবিতে অন্তত চারটি ভিন্ন ভিন্ন ছবি প্রচার করা হচ্ছে৷

রিউমর স্ক্যানার টিম ছবিগুলোর সত্যতা যাচাই করে৷

এর মধ্যে অন্তত দুইটি ছবির ক্ষেত্রে দেখা যায়, উক্ত দাবিতে প্রচারিত ছবি দুইটি পুরানো ও ভিন্ন ঘটনার। ছবিটির মূল উৎস দেখুন এখানে

এই ছবিটির মূল উৎস দেখুন এখানে

কাছাকাছি দাবি পূর্বেও ফেসবুকে প্রচার হয়েছিল

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, একইরকম একটি ঘটনা পূর্বেও ২০২০ সালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক আকারে প্রচার হয়েছিল। তবে তখনকার পোস্টগুলোতে বাচ্চার বয়স দেখানো হয়েছিল ৬ মাস এবং ঘটনাস্থল উল্লেখ করা হয়েছিল নারায়নগঞ্জের আড়াইহাজার। সেসময়কার এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানেএখানে

তবে এসব ফেসবুক পোস্ট ব্যতীত রিউমর স্ক্যানারের প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড অনুসন্ধানে সেসময় কোনো গণমাধ্যম সূত্রে নারায়ণগঞ্জে এমন কোনো ঘটনার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত, বেশ কয়েকদিন ধরে দেশ জুড়ে প্রচণ্ড দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ১৯৬৫ সালের পর গতকাল শনিবার (১৫ এপ্রিল) ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া টানা ১৪ দিন ধরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা পঞ্চগড়ে।

মূলত, পুরো দেশ জুড়ে বেশ কয়েকদিন ধরে প্রচণ্ড দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই মানুষ ঈদের কেনাকাটা সারছেন। এরই প্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি দাবি ছড়িয়ে পড়ে যে, ‘২ মাসের বাচ্চা নিয়ে মায়ের শপিং। প্রচণ্ড গরমে মায়ের কোলেই বাচ্চার মৃত্যু। শপিংয়ের মনোযোগে বুঝতেই পারে নি “মা”।’ তবে রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত তথ্যগুলোতে এই ঘটনার কোনো তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়নি। পাশাপাশি ঘটনাটি বর্ণনার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন জায়গার নাম ও ভিন্ন ভিন্ন শিশুর ছবি প্রচার করা হচ্ছে। এর মধ্যে উক্ত ঘটনাটি কুমিল্লা জেলার চান্দিনার ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হলেও চান্দিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, স্থানীয় সাংবাদিক ও বাসিন্দা সূত্রে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, চান্দিনায় এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এছাড়া ইতোপূর্বে ২০২০ সালেও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানাকে উদ্ধৃত করে প্রায় কাছাকাছি এমন তথ্যের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। তবে ঐ ঘটনারও কোনো বিশ্বস্ত সূত্রে সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সুতরাং, প্রচণ্ড গরমে শপিংয়ে মায়ের কোলে দুই মাসের শিশুর মৃত্যু ও মায়ের বুঝতে না পারার দাবিতে প্রচারিত তথ্যটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: