বিদ্রূপ থেকে চরিত্রহনন: ফেসবুকের এক পেজে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে ধারাবাহিক এডাল্ট মিম

বাম পাশে লাল রঙের পোশাক এবং ডান পাশে সাদা শার্ট ও লুঙ্গি পরা আরেকজন ব্যক্তি দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ক্যাপশনে ‘Oi মঞ্জু mama na plssss’ লিখে গত ২৮ জুন ‘My Meme Cry About It’ নামের একটি স্যাটায়ার পেজ থেকে পোস্ট করা হয়। ছবিটির আলো, ছায়া এবং মুখের সঙ্গে শরীরের অসামঞ্জস্য দেখে বোঝা যায়, এটি ডিজিটালভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে এবং ব্যঙ্গ বা বিদ্রূপ প্রকাশের উদ্দেশ্যে তৈরি। রিভার্স সার্চে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, মূল ছবিটি অন্তত এক দশক আগের, ভারতের। সেখানে যে নারী ও পুরুষের ছবি ছিল তাদের মুখের ওপর বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান এবং মেজর জেনারেল এম আবুল মঞ্জুরের মুখ প্রতিস্থাপন করে প্রচার করা হচ্ছে৷

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সেনা অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। তখন চট্টগ্রামে অবস্থিত সেনাবাহিনীর ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার স্টাফ (জিওসি) ছিলেন আবুল মঞ্জুর। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর আত্মগোপনে যাওয়ার সময় মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে আটক করে পুলিশ। এরপর ওই বছরের ২ জুন তাকে পুলিশ হেফাজত থেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই দুইজনকে নিয়ে আলোচিত এই মিমটি সম্পাদিত ছবি ও ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হেয় বা অপমান করার চেষ্টা করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। এমন উপস্থাপনা অনেক ক্ষেত্রে চরিত্রহননমূলক প্রচারণার অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এই আশঙ্কা আরো পাকাপোক্ত করে পেজটির কনটেন্ট বিশ্লেষণে। গত মাসে পেজটিতে অন্তত ৭৭টি পোস্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ পোস্টে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে জড়িয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ও হেয়প্রতিপন্নমূলক কনটেন্ট প্রচার করা হয়েছে।
ক্ষোভ বেশি ইনকিলাব মঞ্চের ওপর
এক মাসে ‘‘My Meme Cry About It’ নামের স্যাটায়ার পেজটির যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ও হেয়প্রতিপন্নমূলক কনটেন্টগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট পোস্টগুলোতে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে ইনকিলাব মঞ্চের শহীদ ওসমান হাদি ও ফাতিমা তাসনিম জুমাকে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন ওসমান হাদি। ইনকিলাব মঞ্চের এই মুখপাত্রকে গেল বছরের ডিসেম্বরে হত্যা করা হয়। তাকে জড়িয়ে ছয়টি (১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬) কনটেন্ট প্রচার করা হয় পেজটিতে। এর মধ্যে তার সাথে ইনকিলাব মঞ্চের নেত্রী ও ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমাকে জড়ানো হয়েছে চারটি কনটেন্টে।

পোস্টগুলোতে হাদি ও জুমাকে কেন্দ্র করে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ, আপত্তিকর ও অবমাননাকর চিত্রায়ণ করা হয়েছে। ছবিগুলোতে তাদেরকে অন্তরঙ্গ বা যৌন পরিস্থিতিতে দেখানো হয়েছে এবং সঙ্গে এমন ক্যাপশন ও সংলাপ যুক্ত করা হয়েছে, যা তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে বিদ্রূপ, কটাক্ষ ও অপমানজনক ইঙ্গিত তৈরি করে। এসব পোস্টের পুরো উপস্থাপনাটি তাদেরকে হেয় ও বিতর্কিতভাবে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে তৈরি বলে প্রতীয়মান হয়।
বিএনপি-জামায়াতকেও ছাড় নয়, অনুপস্থিত আ.লীগ
এক মাসে ‘‘My Meme Cry About It’ নামের স্যাটায়ার পেজটির যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ও হেয়প্রতিপন্নমূলক কনটেন্টগুলোতে বিএনপি ও জামায়াতেই ইসলামীর নেতা-নেত্রীদের জড়িয়ে অন্তত তিনটি করে পোস্ট দেওয়া হয়েছে। বিএনপিকে জড়িয়ে দেওয়া তিনটি পোস্টের দুইটিতেই জিয়াউর রহমানকে জড়ানো হয়েছে। একটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রথম পোস্টে একটি সিনেমার পোস্টার সম্পাদনা করে খালেদা জিয়ার মুখ বসিয়ে তাকে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ও আপত্তিকর দৃশ্যে দেখানো হয়েছে। দ্বিতীয় পোস্টের বিষয়টি এই প্রতিবেদনের শুরুতেই বলা হয়েছে। তৃতীয় পোস্টে একজন সামরিক পোশাকধারী ব্যক্তির চেহারা এঁকে নেমপ্লেটে জিয়াউর রহমান লিখে ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ ও হেয়প্রতিপন্নমূলক উপস্থাপনা করা হয়েছে।

জামায়াতের ক্ষেত্রেও দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতা আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে বানানো হয়েছে লক্ষ্যবস্তু। প্রথম দুটি পোস্টে (১, ২) শফিকুর রহমান ও জামায়াত দলীয় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজকে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ও আপত্তিকর দৃশ্যে দেখানো হয়েছে। তৃতীয় পোস্টে শফিকুর রহমান ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে পাশাপাশি দেখিয়ে তাদের সম্পর্ক নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ও বিদ্রূপাত্মক ইঙ্গিতপূর্ণ একটি কার্টুনধর্মী মিম তৈরি করা হয়েছে।

এছাড়া, এক্টিভিস্ট তাসফিকুর রব ও তার মাকে জড়িয়ে দুইটি পোস্ট (১, ২) করা হয়েছে পেজে। গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি তাসফিকুর রব তার ফেসবুক প্রোফাইলে আওয়ামী লীগ এর জুম মিটিংয়ের রুম আইডি এবং পাসওয়ার্ড শেয়ার করেন। এরপরই তিনি আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। তার মা এবং তাকে নিয়ে এরপর থেকেই নিয়মিত কুরুচিপূর্ণ পোস্ট করা হচ্ছে৷

পেজটি ঘুরে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের নিয়ে মিম পোস্ট নজরে এলেও আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট কারো বিরুদ্ধে এমন পোস্ট দেখা যায়নি।
পেছনে কারা?
‘My Meme Cry About It’ নামের স্যাটায়ার পেজটি চালু হয় চলতি বছরের গত ০২ জুন। পাঁচ হাজারের অধিক ফলোয়ারের পেজটি পরিচালনা করছে ‘Loki Muse’ নামের একটি ভুয়া প্রোফাইল। এই প্রোফাইল থেকে গত ০২ জুন পেজটি তার বলে পোস্ট করা হয়। গত ০৩ জুন আওয়ামী পন্থী গ্রুপ ক্র্যাক প্লাটুন বাংলাদেশের সক্রিয় সদস্য ‘Rebellious Roar’ নামের প্রোফাইল থেকে করা এক পোস্টে পেজটির বিষয়ে উল্লেখ করা হয়। পোস্টে Loki Muse এর নাম উল্লেখ করে পেজটির রিচ নিয়ে প্রশংসা করা হয়। বলা হয়, রগের চেয়ে এই পেজটির রিচ বেশি। ‘Rog Porichorja Kendro- রগ পরিচর্যা কেন্দ্র’ এবং ‘Rog Porichorja Kendro- রগ পরিচর্যা কেন্দ্র 2.0’ একই গ্রুপ দ্বারা পরিচালিত আরো দুইটি স্যাটায়ার পেজ। ‘Rebellious Roar’ এর পোস্টটিতে Loki Muse এর যে প্রোফাইলকে মেনশন করা হয় সেটি পরে রিপোর্টের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। ০৪ জুলাই প্রোফাইলটি ফের সচল হয়। একই নামে নতুন প্রোফাইল চালু করা হয় গত ২৮ জুন।
গবেষণায় রাজনৈতিক মিমে বিদ্রূপ ও চরিত্রহননের বার্তা
বিভিন্ন একাডেমিক গবেষণায় দেখা যায়, রাজনৈতিক মিম শুধু হাস্যরসের উপকরণ নয়; এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষকে হেয় করা, অপমান করা, বিদ্বেষ ছড়ানো এবং চরিত্রহননের কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, রাজনৈতিক মিমের মাধ্যমে বিদ্রূপ, অবমাননা, বৈরিতা ও ঘৃণার বার্তা স্বাভাবিকীকরণ করা হয় এবং এসব কনটেন্ট ‘শুধু মজা’ হিসেবে উপস্থাপিত হলেও তা রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও তীব্র করে। চলতি বছর নেদারল্যান্ডসের একদল গবেষকের ১৫৮টি গবেষণাপত্রের ওপর পরিচালিত একটি বিস্তৃত পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনলাইনে প্রচারিত মিমে প্রায়ই যৌন ইঙ্গিত, বিদ্বেষ, অবমাননাকর ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্রূপ এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর বয়ান ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় বলা হয়, এ ধরনের মিমের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং উপস্থাপনার কৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলো কেবল বিনোদনের জন্য নয়; বরং ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে হেয় করা, ঘৃণা ও বিভাজন উসকে দেওয়া এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক বয়ান প্রভাবিত করার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

