নেত্রকোণায় শিশু ধর্ষণ: ডিএনএ টেস্টের গুজব, নারী চিকিৎসককে অনলাইনে হেনস্তা

১৮ এপ্রিল ২০২৬, নেত্রকোণার মদন উপজেলার একটি কওমি মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ‘আসিয়া খাতুন’ (ছদ্মনাম) অসুস্থতাবোধ করায় তাকে উপজেলার একটি হাসপাতালে নিয়ে যায় তার পরিবার। পেটের অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করায় আলট্রাসনোগ্রাম করে দেখা যায়, মাত্র ১১ বছর বয়সী এই শিশুটি প্রায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এ সময় ঘটনা জানতে শিশুটির স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা-নিরীক্ষাকারী চিকিৎসক ডা. সায়মা আক্তার তার এবং তার মায়ের সাথে কথা বলে জানতে পারেনন, এ ঘটনার সাথে শিশুটির মাদ্রাসা শিক্ষক জড়িত। পরবর্তীতে ডা. সায়মা এ নিয়ে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট করেন, যা মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। ঘটনাটি জানাজানি হলে সেদিনই ছুটি নিয়ে আত্মগোপনে যান অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষক।

মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ তুলে ফেসবুকে পোস্ট করার পর থেকেই সংঘবদ্ধ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হতে শুরু করেন ডা. সায়েমা আক্তার। বিভিন্ন পোস্টে তার বিরুদ্ধে তোলা হয় নানা অভিযোগ। কোনো কোনো পোস্টে বলা হয়, তিনি একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর; শুধু ভিউ পাওয়ার আশায় নিরীহ আলেমের বিরুদ্ধে এমন ঘৃণ্য অভিযোগ তুলেছেন বলেও দাবি ছড়ায়।

এমনকি তিনি ভিউ পাওয়ার জন্যে এমনটি করেছেন বলে স্বীকারোক্তি প্রদান করে ভিডিওবার্তা প্রচার করেছেন দাবিতে এআই ভিডিও প্রচার করতেও দেখা যায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন হয়রানির পাশাপাশি দেশ ও দেশের বাইরে থেকে তাকে নানা ধরনের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যায়।

এরই মাঝে গত ৫ মে সন্ধ্যা থেকে ফেসবুকে একটি দাবি ছড়িয়ে পড়ে, যাতে বলা হয়, ডিএনএ টেস্ট রিপোর্টের মাধ্যমে জানা গেছে, মাদ্রাসা শিক্ষক নয়, ওই শিশুর ধর্ষক তার নানা।

ভুক্তভোগী শিশুর ডিএনএ টেস্টের বিষয়ে জানতে মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিউমর স্ক্যানারকে জানান, ভুক্তভোগী শিশুর ডিএনএ টেস্টের দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এখনও তার ডিএনএ টেস্ট করা হয়নি।

এছাড়াও অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষককে আটকের পর ০৬ মে দুপুরে র‌্যাবের পক্ষ থেকে করা এক সংবাদ সম্মেলনেও একই তথ্য জানানো হয়। র‌্যাবের পক্ষে থেকে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পরা শিশুটির ভ্রুণের ডিএনএ টেস্টের দাবিটি গুজব।

অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরকে আটকের আগে থেকেই এমন তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। যা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। অর্থাৎ, ডিএনএ টেস্ট না হওয়া এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি আটক হওয়ার পূর্বেই ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে ঘটনার সাথে তার সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ার দাবিটি অবান্তর। এছাড়াও ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে মাদ্রাসা শিক্ষক নির্দোষ এবং ধর্ষক শিশুটির আপন নানা – এমন দাবিটিি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়।

পাশাপাশি ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে ভুক্তভোগী ওই শিশুটির মায়ের দায়ের মামলার এজাহারেও মাদ্রাসা শিক্ষককে অভিযুক্ত করে বলা হয়, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী উপজেলার ফাতেমা তুযযহরা মহিলা কওমি মাদরাসার দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী।

‘গত বছরের দোসরা নভেম্বর বিকেলে মাদ্রাসা ছুটির পর অভিযুক্ত শিক্ষক মেয়েটিকে ডেকে মাদ্রাসা সংলগ্ন মসজিদ ঝাড়ু দিতে বলেন। ওইদিন বিকেলে মাদ্রাসার অন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যান। ঝাড়ু শেষে একটি কক্ষে মেয়েটিকে ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণ করেন। এ ঘটনা কাউকে জানালে ওই শিশুকে এবং তাঁর মা ও ছোট ভাইদের মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়’।

অভিযোগে আরও বলা হয়, এর চার পাঁচদিন পর আবারো শিশুটিকে ধর্ষণ করেন ওই মাদ্রাসা শিক্ষক।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শিশুর মায়ের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিউমর স্ক্যানারকে জানান, তার মেয়ে নানা বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে। আর তিনি সিলেটে গৃহকর্মীর কাজ করেন। সম্প্রতি, তার মেয়ে অসুস্থ বোধ করায় এবং তার মাঝে শারীরিক কিছু পরিবর্তন দেখা দেওয়ায় তিনি সিলেট থেকে এসে মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বিষয়টি জানতে পারেন। পরে মেয়েকে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার পর তার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার তথ্যটি জানতে পারেন।

বিষয়টি জানাজানি হলে ওই মাদ্রাসা শিক্ষকের বড়ভাই টাকা দিয়ে ঘটনাটি সুরাহা করার চেষ্টা করেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তবে তারা ন্যায় বিচারের আশায় অভিযুক্ত শিক্ষককে এবং তার বড় ভাইকে আসামি করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন বলেও জানান তিনি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে ডা. সায়েমা আক্তারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে সাড়া মেলেনি। তার স্বামী রিউমর স্ক্যানারকে জানান, নেত্রকোণার আলোচিত এই ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে তিনি ফেসবুকে পোস্ট করার পর থেকেই তাকে নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে। সংঘবদ্ধ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়ায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলেও জানান তার স্বামী। বর্তমানে ডা. সায়েমা আক্তার তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি ডিজাবল রেখেছেন এবং স্থানীয় থানায় এসবে বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডাইরিও করা হয়েছে বলে তার স্বামীর কাছ থেকে জানা যায়।

শুধু নেত্রকোণার ঘটনাই নয়—সামাজিক বা জনস্বার্থের বিষয়ে নারীরা সোচ্চার হলেই তারা প্রায়শই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মত প্রকাশের পর তাদের লক্ষ্য করে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমানজনক মন্তব্য, সংগঠিত ট্রলিং এবং ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এসব আক্রমণ কেবল মতবিরোধে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ফলে মানসিক চাপের কারণে অনেক নারী প্রকাশ্যে মত প্রকাশে অনীহা বা দ্বিধায় ভোগেন।

Share: