বিগত দুই সরকারের আমলে হামের টিকা দেওয়া হয়নি শীর্ষক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটি সঠিক নয়

গত ১৮ এপ্রিল ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সম্মেলন-২০২৬-এ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে বলেন, ‘সারা দেশে শিশুদেরকে হামের টিকা না দেওয়ার ফলে বিগত ইমিডিয়েট দুটি সরকারের জীবন বিনাশী ব্যর্থতা মনে হয় ক্ষমাহীন অপরাধ’।

অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দাবি করেছেন বিগত দুই সরকার (ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার) শিশুদের হামের টিকা দেয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর এরূপ বক্তব্যের ভিডিও সংযুক্তিসহ সংবাদ দেখুন এখানে, এখানে

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত দুই সরকারের আমলে হামের টিকা দেওয়া হয়নি শীর্ষক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দাবি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে একাধিকবারসহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও হামের টিকা প্রদান করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে ‘ইউনিসেফ বাংলাদেশ’ এর ফেসবুক পেজে ২০১৯ সালের ২৪ এপ্রিলে প্রচারিত একটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘আজ শুরু হলো বিশ্ব টিকাদান সপ্তাহ।’ পোস্টটিতে একটি পোস্টারেরও সংযুক্তি পাওয়া যায় যাতে লেখা রয়েছে, ‘৯ মাস পূর্ণ হলে হাম-রুবেলা টিকার ১ম ডোজ ও ১৫ মাস পূর্ণ হলে ২য় ডোজ টিকা দিতে শিশুকে নিকটস্থ টিকা কেন্দ্রে নিয়ে আসুন’। এছাড়াও, ২০১৯ সালের সেসময়ে হাম ও রুবেলার টিকাপ্রদান সফল করতে সচেতনামূলক/এ্যাডভোকেসি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার নানা ছবিও অনলাইনে পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ২০১৯ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত হাম-রুবেলার টিকাদান করা হয়েছিল।

তাছাড়া, ইউনিসেফ বাংলাদেশের ফেসবুক পেজে ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বরে আরেকটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টে বলা হয়, ‘সারাদেশে শুরু হয়ে গেল ছয় সপ্তাহব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২০!’ পাশাপাশি, নওগাঁ সদর উপজেলা পরিষদের ২০২১ সালের জানুয়ারী মাসে অনুষ্ঠিত উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভার কার্যবিবরণীতে, ‘হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২০’ ১২ ডিসেম্বর ২০২০ হতে ৩১ জানুয়ারী ২০২১ পর্যন্ত চলার বিষয়ে উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়াও, দিনাজপুর সদর উপজেলা পরিষদের ‘ফেব্রুয়ারি/২০২১’ মাসের সাধারণ সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, ১৯/১২/২০২০ খ্রিঃ হতে হাম রুবেলা ক্যাম্পেইন ইউনিয়ন পর্যায়ে শুরু হয়ে ৩১/০১/২০২১ খ্রিঃ তারিখ পর্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে।

পাশাপাশি, ২০২০ সালের ডিসেম্বর ও ২০২১ সালের জানুয়ারিতে টিকাদান সংক্রান্ত নানা ছবি ফেসবুকে স্বাস্থ্যকর্মীসহ সরকারি বেসরকারি নানা ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক প্রচার হতে দেখা যায় যার অনেকগুলোতে টিকাদান কেন্দ্র ও টিকা প্রদানের ছবিও পাওয়া যায়।

এছাড়াও, অনুসন্ধানে ইউনিসেফ বাংলাদেশের ইপিআই (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) বিশেষজ্ঞ সরওয়ার আলম সাংকু’র ফেসবুক অ্যাকাউন্টে গত ২৯ মার্চে প্রচারিত একটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টে বেশকিছু উপাত্ত সংবলিত পরিসংখ্যান এর একটি স্ক্রিনশটের সংযুক্তিসহ ক্যাপশনে সরওয়ার আলম লিখেন, ‘গত ৮ বছরে হামের টিকা দেয়া হয় নাই কথাটা মোটেও ঠিক নয়। এটা বাংলাদেশের ইপি আই প্রোগ্রামের মত একটা বিশ্বনন্দিত সফল প্রোগ্রামের সাথে তামাশা। গত ৯ বছরের ডাটা দিলাম। ৯ বছরে প্রায় সাড়ে ৩ কোটির কাছাকাছি শিশুদের টিকা দেয়া হয়েছে যেটা সরকারি এডমিনিস্ট্রেটিভ রিপোর্ট। প্রায় বছরই কাভারেজ ৯৫% এর কাছাকাছি। মাঝে ২০২০-২০২১ এ সাড়ে ৩ কোটি বাচ্চাকে ১ ডোজ টিকা দেয়া হয় হাম রুবেলা ক্যাম্পেইন এ। সেখানেও শতভাগের কাছাকাছি কাভারেজ ছিল।’

পোস্টটিতে সরওয়ার আলম বর্তমানে হাম হওয়ার কারণ হিসেবে দাবি করেন, ‘সত্যিকার ফিল্ডের বাস্তবতা ভিন্ন। ৯৫% এডমিনিস্ট্রেটিভ কাভারেজ হলেও সার্ভ করে দেখা যায় ২ ডোজ ভ্যালিড টিকার কাভারেজ ৮২% এর মত। প্রতি বছর ২০% এর মত শিশু সেই হিসেবে হামের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি হচ্ছে না। এই সংখ্যা যখন ১০০% বা একটা বার্থ কোহর্ট এর সমান হয়ে যায় তখন শুরু হয় বড় আকারে আউটব্রেক। বছরে ২০% হিসেবে ২০২০-২১ এর ক্যাম্পেইনের পর ইতিমধ্যে সেই টিকা না পাওয়া বাচ্চাদের সংখ্যা একটা বছরের শিশু জন্মের সমান হয়ে গেছে। এখন দ্রুত ক্যাম্পেইন করে এই আউটব্রেক থামানো সম্ভব।’

সরওয়ার আলমের পোস্টটিতে সংযুক্ত হামের টিকার প্রশাসনিক পরিসংখ্যান ছবিতে দেখা যায়, ২০২৫ সালে হামের টিকার কাভারেজ ছিলো ১ম ডোজের ক্ষেত্রে ৯২.৭৩ শতাংশ এবং ২য় ডোজের ক্ষেত্রে ৯০.৭৮ শতাংশ। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই হামের টিকার কাভারেজ ১ম ডোজের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশের বেশি ছিল এবং ২য় ডোজের ক্ষেত্রে ২০১৭ (৮৭.২৪ শতাংশ) ও ২০২০ (৮৯.৯৬ শতাংশ) সাল ছাড়া বাকী প্রতি বছরই ৯০ শতাংশের বেশি ছিল।

অনুসন্ধানে সরওয়ার আলমের পোস্টটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের ‘সার্ভেইল্যান্স অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন মেডিক্যাল অফিসার (SIMO)’ খাদিজা আহমেদ আঁখিকেও শেয়ার দিতে দেখা যায়।

উপরোক্ত তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বিগত দুই সরকারের আমলেও হামের টিকা প্রদান করা হয়েছে।

সুতরাং, বিগত দুই সরকারের আমলে হামের টিকা দেওয়া হয়নি শীর্ষক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দাবি মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: