সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিওতে শহীদ মিনার ভাঙার ৭টি ঘটনা নিয়ে ৩৭ সেকেন্ডের একটি ফুটেজ প্রচার করে দাবি করা হয়েছে, এগুলো ২০২৫ সালে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের ঘটনা।

উক্ত দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত ভিডিও দেখুন এখানে, এখানে, এখানে।
একই দাবির ইনস্টাগ্রাম ভিডিও দেখুন এখানে।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রচারিত ভিডিওতে থাকা ২টি ভিডিও ও ৫টি ছবির সবগুলো ২০২৫ সালের নয়। প্রকৃতপক্ষে, এর মধ্যে ৪টি ঘটনাই শেখ হাসিনা সরকারের সময়ের, বাকি তিনটি ২০২৫ সালের।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে ভিডিওতে প্রচারিত ঘটনাগুলো পৃথকভাবে যাচাই করেছে রিউমর স্ক্যানার।
ভিডিও যাচাই ১
এই ভিডিওটির বিষয়ে ২০২৫ সালেই অনুসন্ধান করে ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করে রিউমর স্ক্যানার৷ সে বছর শহীদ দিবসে শিক্ষার্থী কর্তৃক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার ভাঙচুরের এই ঘটনা বিদ্বেষমূলক সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছিল। তবে রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে জানায়, বিদ্যালয়টিতে নতুন করে বড় একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করায় প্রধান শিক্ষকের অনুমতি সাপেক্ষে পুরাতন ছোট শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলা হয়।

অর্থাৎ, এই ভিডিওটি ২০২৫ সালের, তবে যুক্তিসঙ্গত কারণেই তা ভাঙা হয়েছিল।
ভিডিও যাচাই ২
এই ভিডিওটি নিয়ে অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শহীদ দিবসে প্রভাতফেরির পর গাজীপুর মডেল পাবলিক স্কুলে অস্থায়ী শহীদ মিনার লাথি দিয়ে ভাঙার ঘটনা ঘটে। ওই স্কুলের দুই ছাত্র এ ঘটনা ঘটায়। স্কুলটি শ্রীপুরের গাজীপুর ইউনিয়নের গাজীপুর গ্রামে অবস্থিত। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত তাদের সামাজিক শাস্তির আওতায় আনা হয়। শাস্তি হিসেবে সেই দুই শিক্ষার্থী প্রতিদিন স্কুল পরিষ্কার করবে।

Comparison: Rumor Scanner
অর্থাৎ, এই ভিডিওটিও ২০২৫ সালেরই।
ছবি যাচাই ৩
এই ফুটেজটির বিষয়ে অনুসন্ধানে অনলাইন সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ২৪ এর ওয়েবসাইটে ২০১৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে একই ছবি পাওয়া যায়। জানা যায়, কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের অন্তর্গত মহেন্দ্রপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে দুর্বৃত্তরা শহীদ মিনারটি ভাংচুর করে।

বিডিনিউজের খবরে স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি শরিফুল ইসলামের বরাতে এই ঘটনার জন্য জামায়াতে ইসলামী এবং এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মীদের দায়ী করা হয়।
অর্থাৎ, এই ফুটেজটি ১২ বছর পূর্বের, যে সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল।
ছবি যাচাই ৪
ফুটেজটির বিষয়ে অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের ওয়েবসাইটে গত বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়, যাতে একই ছবি রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গুণবতী ডিগ্রি কলেজের শহীদ মিনার ভেঙে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিলাল উদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এ ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় কারা শহীদ মিনার ভেঙেছে তা এখনই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তবে স্থানীয়রা এ কাজে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

অর্থাৎ, এই ফুটজটি ২০২৫ সালেরই।
ছবি যাচাই ৫
ছবিটির বিষয়ে অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকার ওয়েবসাইটে ২০২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে একই ছবি পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সে সময় মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বাবুখালী আদর্শ কলেজের শহীদ মিনার ভেঙে ফেলে দুর্বৃত্তরা।

দেশ রূপান্তর জানায়, মহম্মদপুর থানার ওসি বোরহান উল ইসলাম বলেন, ‘সকালে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। দুর্বৃত্তরা কলেজের পুরনো শহীদ মিনার ও বর্তমান নির্মাণাধীন নতুন শহীদ মিনারের কিছু অংশে ভাঙচুর করেছে। কলেজের জায়গা লিজ নিয়ে দোকানঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরে কলেজ কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে মিজানুর মৃধার ঝামেলা চলছে। জড়িতদের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম চলছে।’
অর্থাৎ, এই ছবিটি ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের।
ছবি যাচাই ৬
ছবিটির বিষয়ে অনুসন্ধানে মূল ধারার গণমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের ওয়েবসাইটে ২০১৭ সালের ২৬ জুলাই প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে একই ছবি পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার কোটালীপাড়া ইউনিয়ন ইন্সটিটিউশনের শহীদ মিনার দুই যুবক ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে পুলিশের বক্তব্যও পাওয়া যায়৷ কোটালীপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামরুল ফারুক বলেন, ‘ভিডিও চিত্র দেখে আমরা দুই যুবককে চিহ্নিত করেছি। তাদের নাম ঠিকানা আমাদের কাছে আছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম ঠিকানা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। আমরা অভিযান চালিয়ে ওই দুই জনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছি। এ ব্যাপারে মামলা দায়ের করা হবে।’
অর্থাৎ, এই ছবিটি ২০১৭ সালের। সে সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল।
ছবি যাচাই ৭
এই ছবিটির বিষয়ে অনুসন্ধানে সংবাদমাধ্যম নিউজবাংলা২৪ এর ওয়েবসাইটে ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে একই ছবি পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সে বছরের ১৬ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে পাকিস্তানের ক্রিকেট জার্সি গায়ে চড়িয়ে জুতা পায়ে এক ব্যক্তির শহীদ মিনার ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া যায়। উক্ত ব্যক্তিকে আটকও করে পুলিশ।

প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত ২১ বছর বয়সী ওই যুবকের নাম মো. আব্দুর রহিম হৃদয়। তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন জোরারগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল্লাহ আল হারুন। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের কাছে তার বিষয়ে অভিযোগ পেয়ে তৎক্ষণাৎ আমরা তাকে গ্রেপ্তার করেছি। তিনি ঘটনার বিষয়ে স্বীকার করে বলেছেন, আবেগতাড়িত হয়ে তিনি হঠাৎ কাজটি করেছেন।’
অর্থাৎ, এই ছবিটি ২০২৩ সালের। সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল।
সুতরাং, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ২০২৫ সালে শহীদ মিনার ভাঙার ৭টি দৃশ্য দাবিতে প্রচারিত ফুটেজের ৪টিই আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের; দাবিটি বেশিরভাগই মিথ্যা।
তথ্যসূত্র
- Prothom Alo: শহীদ মিনার ভাঙার শাস্তি হিসেবে প্রতিদিন স্কুল পরিষ্কার করবে দুই ছাত্র
- Bdnews24: Shaheed Minar defaced
- The Daily Star: চৌদ্দগ্রামে গুণবতী ডিগ্রি কলেজের শহীদ মিনার ভাঙচুর
- Desh Rupantor: শহীদ মিনার ভাঙল দুর্বৃত্তরা
- Bangla Tribune: কোটালীপাড়ায় স্কুলের শহীদ মিনার ভাঙচুর (ভিডিও)
- Newsbangla24: পাকিস্তানের জার্সি গায়ে শহীদ মিনার ভাঙচুর, সেই যুবক গ্রেপ্তার
- Rumor Scanner’s Analysis


