ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার দৃশ্য দাবিতে এআই-তৈরি ও পুরোনো ভিডিও প্রচার

চলমান ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষিতে কথিত চারটি সিসিটিভি ফুটেজের সমন্বয়ে তৈরি একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়েছে, ভিডিওটি ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার দৃশ্যের।

এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

এরূপ দাবিতে ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রচারিত ভিডিওটি সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার দৃশ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, ভিডিওটিতে দেখানো চারটি কথিত সিসিটিভি ফুটেজের মধ্যে তিনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি এবং বাকি একটি ফুটেজ ইরানে হামলার আসল দৃশ্য হলেও সেটি গত বছরের ঘটনা।

আলোচিত ভিডিও পর্যবেক্ষণ করলে তাতে ‘kaabusia’ লেখা একটি জলছাপ লক্ষ্য করা যায়৷ এরই সূত্র ধরে অনুসন্ধানে ‘kaabusia’ নামের একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বরে সম্ভাব্য মূল ভিডিওটি পাওয়া যায়।

ভিডিওর ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে, ‘কয়েক মাস পর বেশ কিছু ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আয়াতুল্লাহ শাসনামলের সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানার মুহূর্তগুলো দেখা যাচ্ছে।’ তবে ভিডিওর ফুটেজগুলো কারা প্রকাশ করেছে এবং সুনির্দিষ্ট কোন স্থানের এরূপ কোনো প্রাসঙ্গিক তথ্যপ্রমাণের উল্লেখ ইনস্টাগ্রাম ভিডিওটিতে পাওয়া যায়নি। এছাড়াও, ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি পর্যবেক্ষণ করলে এটি কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম নয় বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

পাশাপাশি, অনুসন্ধানে আলোচিত ভিডিওতে প্রদর্শিত চারটি সিসিটিভি ফুটেজের একটি ব্যতীত বাকী তিনটিরই কোনো অস্তিত্ব ইরানি মূলধারার বা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি। আলোচিত ভিডিওতে প্রদর্শিত চারটি সিসিটিভি ফুটেজের কেবলমাত্র তৃতীয় ফুটেজটি ইরানি গণমাধ্যমে পাওয়া যায়। উক্ত ফুটেজটি ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম ‘এসএনএন টিভি’র টেলিগ্রাম চ্যানেলে গত ২৮ নভেম্বরে প্রচার হতে দেখা যায়। তবে ভিনদেশিয় অডিও হওয়ায় ভিডিওটির সম্পর্কে কী বলা হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ভিডিওটির বিষয়ে অধিকতর অনুসন্ধানে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়ার ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বরে আলোচিত সিসিটিভি ফুটেজটি প্রচার হতে দেখা যায়। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন শুক্রবার সন্ধ্যায় তাবরিজের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ‘নাজম’ (Najm) রাডার সিস্টেম লক্ষ্য করে হামলার মুহূর্তের কিছু ছবি প্রকাশ করেছে, যা ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়েছিল। ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এই হামলাগুলো ছিল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং এর ফলে ইরানি সামরিক বাহিনী “ক্ষয়ক্ষতির” সম্মুখীন হয়েছে।’ (স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনূদিত)

এছাড়াও, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘Ynet’ এর এক্স অ্যাকাউন্টেও গত বছরের ২৯ নভেম্বরে উক্ত সিসিটিভি ফুটেজটি প্রচার হতে দেখা যায়। ফুটেজের বিষয়ে পোস্টে বলা হয়, ‘ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ (২০২৫ সালের জুনে হওয়া যুদ্ধ) শেষ হওয়ার পাঁচ মাস পর, শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) ইরানের রাষ্ট্রীয় নেটওয়ার্ক SNN পূর্বে অপ্রকাশিত কিছু ফুটেজ প্রচার করেছে। সেখানে তারা ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ইসরায়েলি হামলার বর্ণনা দিয়েছে। সম্প্রচারটিতে দাবি করা হয়েছে যে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা “জানতেন যে তারা লক্ষ্যবস্তু হতে যাচ্ছেন—তবুও তারা তাদের অবস্থান ত্যাগ করেননি।’ (অনূদিত)

অর্থাৎ, এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে প্রচারিত কথিত চারটি সিসিটিভি ফুটেজের মধ্যে তৃতীয় ফুটেজটি ইরানে ২০২৫ সালে হামলার হওয়ার আসল ফুটেজ। বাকী তিনটি কথিত সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করলে তাতে বেশকিছু অসংগতি লক্ষ্য করা যায়। বিস্ফোরণ সত্ত্বেও একজন কর্মকর্তাকে স্বাভাবিকভাবেই তার কম্পিউটারের সামনে বসে থাকতে দেখা যায়। বিস্ফোরণের খুব কাছে থাকা সম্ভাব্য কফি মেশিন ও ল্যাপটপ সম্পূর্ণ স্থির বা অবিচলিত অবস্থায় দেখা যায়। এছাড়াও, বিস্ফোরণের পরও সিসিটিভি কাজ করতে দেখা যায় যেখানে উপরোল্লিখিত আসল সিসিটিভি ফুটেজে বিস্ফোরণের পর অন্ধকার হয়ে যেতে দেখা যায়। তাছাড়া, ডিজিটাল দেয়াল ঘড়ির সংখ্যাগুলোও অস্বাভাবিক হিসেবে পরিলক্ষিত হয়।

এছাড়াও অনুসন্ধানে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র বিশেষায়িত ফরেনসিক ও ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট ‘বিবিসি ভেরিফাই’-এর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ‘শায়ান সরদারিজাদেহ’ এর এক্স অ্যাকাউন্টে গতবছরের ২ ডিসেম্বরে আলোচিত ভিডিওটির বিষয়ে একটি পোস্ট পাওয়া যায়। তিনিও তার পোস্টে বলেন, ‘তৃতীয় ক্লিপটি বাদে—যা ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ডের এবং আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রচারিত হয়েছিল—১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানি সামরিক স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলার এই বাকি তথাকথিত নতুন সিসিটিভি ক্লিপগুলো এআই-জেনারেটেড এবং ভুয়া। এতে দৃশ্যমান উল্লেখযোগ্য ভুলগুলো হলো: ভুল সামরিক র‍্যাঙ্ক প্যাচ ও ইউনিফর্ম, ডেস্ক এবং ক্যাবিনেটের ওপর অদ্ভুত হাত ও বস্তু, বিস্ফোরণের পরেও কর্মীদের স্বাভাবিকভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া এবং তথাকথিত সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর কোনো ক্ষতি না হওয়া। (অনূদিত)

এছাড়াও, আলোচিত ভিডিওর বিষয়ে একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্যাক্টচেকিং প্ল্যাটফর্ম ও গণমাধ্যমে গতবছর ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ হতে দেখা যায়। তাতেও আলোচিত ভিডিওর চারটি ফুটেজের তিনটি ফুটেজই এআই দিয়ে তৈরি ও একটি পুরোনো দৃশ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

উপরোল্লিখিত তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে সাম্প্রতিক সময়ের ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার দৃশ্য দাবিতে প্রচারিত ভিডিওতে প্রদর্শিত কথিত চারটি সিসিটিভি ফুটেজের মধ্যে তিনটি ফুটেজই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি এবং অপরটি ইরানের ওপর গতবছরের হামলার দৃশ্য।

সুতরাং, পুরোনো ভিডিও ও এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও একত্র করে সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার দৃশ্য দাবি করে ভিডিওটি প্রচার করা হয়েছে; যা বিভ্রান্তিকর।

তথ্যসূত্র

Share: