হিন্দু যুবক অভির লাশ দাবিতে ভিন্ন ঘটনার পুরোনো ভিডিও প্রচার 

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভারত ভিত্তিক নানা অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়েছে, ‘ভয়াবহ দৃশ্য। ইসলামপন্থীদের একটি জনতা হিন্দু ছাত্র অভি দাসকে বেঁধে জীবিত অবস্থায় নদীতে ছুড়ে ফেলে দেয়। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।’

এরূপ দাবিতে এক্সে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

এরূপ দাবিতে ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রচারিত ভিডিওটি সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধারকৃত হিন্দু যুবক অভির লাশের দৃশ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, গত বছরের জুন মাসে জনি সরকার নামে নারায়নগঞ্জে এক যুবকের বস্তাবন্দী লাশ নালা থেকে উদ্ধারের ঘটনার দৃশ্যকে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। এছাড়া, অভি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন বরং, নওগাঁ সরকারি কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

অনুসন্ধানে ‘Jabed Ahmed Jabed Ahmed’ নামক একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে গত ১৭ জুন প্রচারিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। উক্ত ভিডিওটিতে থাকা লাশ এবং লাশের পাশে থাকা মানুষের সঙ্গে আলোচিত ভিডিওতে লাশ ও লাশের পাশে থাকা মানুষের পোশাক এবং চেহারার মিল রয়েছে।

জাবেদ আহমেদের পোস্টের ক্যাপশনের দাবি অনুযায়ী এটি গত ১৭ জুন ফতুল্লা পূর্ব শিয়াচর লালখা এডভান্স গার্মেন্টসের সামনে নতুন রাস্তা নামে পরিচিত এলাকার রাস্তার পাশের ড্রেন থেকে বস্তাভর্তি লাশ উদ্ধারের দৃশ্য।

উক্ত সূত্র ধরে অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক যায়যায়দিনের ওয়েবসাইটে “ফতুল্লায় ড্রেন থেকে যুবকের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার”- শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, গত ১৭ জুন সকাল সাড়ে ১১ টায় ফতুল্লার পূর্ব শিহাচর লালখাঁ এলাকায় রাস্তার পাশের ড্রেন থেকে জনি সরকার (২৫) নামে এক যুবকের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত জনি সরকার সিলেট জেলার জামালগঞ্জ থানার বিশ্নপুর গ্রামের করুনা সরকারের ছেলে। সে তার পরিবারের সঙ্গে ফতুল্লার লালখাঁ এলাকায় বসবাস করতো।

ফতুল্লা মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, প্লাষ্টিকের বস্তায় হাত পা বাধা অবস্থায় ড্রেন থেকে জনি সরকারের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

পরবর্তীতে গত ১৯ জুন প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে “অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মাদকাসক্ত ছেলেকে হত্যা করেন মা–বাবা: পুলিশ”- শিরোনামে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে আলোচিত ঘটনার বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়।

গত ১৯ জুন নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক সার্কেল) মো. হাসিনুজ্জামান বলেছেন, পুলিশ তদন্ত করতে গিয়ে ছেলে হত্যায় বাবা করুণা সরকারের সম্পৃক্ততা পায়। পরে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে বাবার সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, ছেলে মাদকাসক্ত ছিল। প্রায়ই টাকার জন্য বাড়িঘরে ভাঙচুর করতেন। বাবা-মাকেও মারধর করতেন। দীর্ঘদিন ছেলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাবা ঘুমের মধ্যে মাথায় রুটি তৈরি করার বেলন দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেন। মা অসিতা রানী সরকার তাঁর স্বামীকে সহায়তা করেন।

পাশাপাশি, একই তথ্য নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের ফেসবুক পেজ থেকেও প্রচার করা হয়।

অর্থাৎ, প্রচারিত ভিডিওতে থাকা বস্তাবন্দী লাশটি জনি সরকার নামক এক যুবকের।

অপরদিকে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত পোস্টে সংযুক্ত যুবকের বিষয়ে অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যম সময় টিভি’র ওয়েবসাইটে গত ১৮ জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে আলোচিত যুবকের ছবির সংযুক্তি পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, নওগাঁ শহরের কালিতলা মহাশ্মশান সংলগ্ন নদী থেকে নিখোঁজের ৬ দিন পর উদ্ধার করা হয়েছে কলেজছাত্র অভির নিথর দেহ। শনিবার (১৭ জানুয়ারি) বিকেলে নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় এক অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়লে অভির পরিবার এসে মরদেহটি শনাক্ত করে। নিহত অভি বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারের বাসিন্দা রমেশ চন্দ্রের বড় ছেলে। তিনি নওগাঁ সরকারি কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করে অভিকে বেঁধে হত্যা করা হয়েছে এরূপ দাবির সপক্ষে নির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া, এ বিষয়ে নওগাঁ সদর মডেল থানার ওসি বরাবর অভির পিতার লেখা পত্র থেকে জানা যায়, নিহতের বাবা লিখেন ‘আমার ছেলে আমাদের উপর অভিমান করে পানিতে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করিয়াছে বলিয়া আমার মনে হয়। আমার ছেলের মৃত্যুতে আমি সহ আমার কোন আত্মীয় স্বজনদের কাহারো উপর কোন অভিযোগ নাই। এই বিষয়ে আমি কিংবা আমার পরিবারের লোকজন কারো বিরুদ্ধে কোন প্রকার মামলা মোকদ্দমা করবো না।’

উল্লেখ্য, আলোচিত ভিডিওটি এর আগেও ভিন্ন এক ভুয়া দাবিতে প্রচার করা হলে সেসময় এ বিষয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে রিউমর স্ক্যানার টিম।

সুতরাং, সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধারকৃত হিন্দু যুবক অভির লাশের দৃশ্য দাবিতে পুরোনো ভিন্ন ঘটনার ভিডিও প্রচার করা হয়েছে; যা বিভ্রান্তিকর।

তথ্যসূত্র

Share: