জুনে পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ হবে দাবিতে পুরোনো সংবাদ প্রচার

সম্প্রতি শর্ট ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটকে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে যাতে একজন সংবাদ উপস্থাপিকাকে বলতে শোনা যায়, ‘কয়লার অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ডলার সংকটের কারণে কয়লার ৩১৩৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে না পারায় সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানিয়েছেন, ৫ জুনের পর পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। আর এটি বন্ধ হলে লোডশেডিং পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ।…’

ভিডিওটি প্রচার করে দাবি করা হয়েছে, ‘লোডশেডিং অবস্থা খারাপ ৫-জুন বন্ধ হয়ে যাবে পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র | বিদ্যুৎ থাকবে না আগামি ২৫দিন’।

এরূপ দাবিতে টিকটকে প্রচারিত ভিডিওটি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়া অবধি আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি ৩ লক্ষ ৪৫ হাজারেরও অধিক বার দেখা হয়েছে এবং প্রায় ৭ হাজারটি পৃথক অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটিতে লাইক দেওয়া হয়েছে।

এছাড়াও, টিকটকে আরেকটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়েছে, ‘২১ দিন কারেন্ট থাকবে না’। উক্ত ভিডিওর অডিওতে একজন সংবাদ উপস্থাপিকার কণ্ঠে শোনা যায়, ‘সময়মতো কয়লার বকেয়া বিল ডলারে পরিশোধ করতে না পারায় আগামীকাল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র পায়রা। আগামী ২৫ জুনের আগে সেটি চালু হওয়ার সম্ভাবনাও কম। কর্তৃপক্ষ বলছে, বকেয়ার একটা অংশ, প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের পর নতুন করে এলসি খুললেও কয়লা আসতে সময় লাগবে অন্তত তিন সপ্তাহ। ফলে অন্তত ২১ দিন বন্ধ থাকবে দেশের সবচেয়ে সাশ্রয়ী এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি।’

এরূপ দাবিতে টিকটকে প্রচারিত ভিডিওটি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, আগামী ৫ জুনের পর পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে শীর্ষক দাবিটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, প্রচারিত সংবাদ ভিডিওটি ২০২৩ সালের ৩ জুনের যা সাম্প্রতিক সংবাদ দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।

আলোচিত দাবিতে প্রচারিত প্রথম ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যম ‘আরটিভি’র ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৩ সালের ৩ জুনে ‘কয়লার অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ শিরোনামে প্রচারিত একটি সংবাদ প্রতিবেদন পাওয়া যায়। উক্ত সংবাদ প্রতিবেদনে উপস্থাপিকার বলা কথার সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওতে সংবাদ উপস্থাপিকার বলা কথার মিল পাওয়া যায়। এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে প্রচারিত ভিডিওটি প্রকৃতপক্ষে ২০২৩ সালের সংবাদের।

আলোচিত দাবিতে প্রচারিত দ্বিতীয় ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যম ‘যমুনা টিভি’র ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৩ সালের ৩ জুনে ‘রাত পোহালেই বন্ধ হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ শিরোনামে প্রচারিত আরেকটি সংবাদ প্রতিবেদন পাওয়া যায়। উক্ত সংবাদ প্রতিবেদনে উপস্থাপিকার বলা কথার সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওতে সংবাদ উপস্থাপিকার বলা কথার মিল পাওয়া যায়। এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে প্রচারিত দ্বিতীয় ভিডিওটিও ২০২৩ সালের সংবাদের।

এরই সূত্র ধরে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলে জাতীয় দৈনিক ‘দ্যা ডেইলি স্টার’ এর ওয়েবসাইটে ২০২৩ সালের ৫ জুনে এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়লার অভাবে ২০২৩ সালের ৫ জুনে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মধ্যে ৬৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার একটি ইউনিট ২০২৩ সালের ২৫ মে বন্ধ হয়ে যায়। অপর ইউনিটটি ২০২৩ সালের ৫ জুনে বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোদমে চালাতে গড়ে প্রতিদিন ১২ হাজার টন কয়লা দরকার হয়। এর পুরোটাই ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করে আসছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রটির চীনা অংশীদার সিএমসি। ডলার সংকট দেখা দেওয়ায় সেসময় বিগত ৬ মাস ধরে কয়লার বিল পরিশোধ করা হয়নি। ফলে ২০২৩ সালের বছরের এপ্রিল পর্যন্ত কয়লা বাবদ প্রায় ৩৯০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া হয়।

এ বিষয়ে ২০২৩ সালের ২৫ জুনে মূলধারার সংবাদমাধ্যম যুগান্তরের এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, জ্বালানি সংকটে টানা ২০ দিন বন্ধ থাকার পর ২০২৩ সালের ২৫ জুন সকালে আবারও চালু হয়েছে পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র। সেদিন ৬৬০ মেগাওয়াট উৎপাদনে সক্ষম বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট চালু করা হয়। এর দু’দিন আগে ২০২৩ সালের ২৩ জুন মধ্যরাতে ইন্দোনেশিয়া থেকে ৪১ হাজার ২০৭ মেট্রিক টন কয়লা জাহাজে করে আনা হয়।

এছাড়াও, প্রচারিত সংবাদে উপস্থাপিকাকে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নসরুল হামিদের নাম উল্লেখ করতে দেখা যায়। নসরুল হামিদ প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগের আমলের সময়ের প্রতিমন্ত্রী। বর্তমানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

পাশাপাশি, প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলেও আগামী জুন থেকে পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার দাবির সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণও পাওয়া যায়নি। অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘বাংলা ট্রিবিউন’ এর ওয়েবসাইটে গত ৭ এপ্রিলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোদমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। তবে প্রতিবেদনে এও উল্লেখ করা হয় যে, কয়লার অভাবে পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশের আরেক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র মাতারবাড়ি কয়লা সংকটে পড়েছে। গত কয়েক দিন ধরেই দেখা যাচ্ছে মাতারবাড়ি আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল পাওয়ারপ্ল্যান্ট পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না।

সুতরাং, আগামী ৫ জুনের পর পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে দাবিতে ২০২৩ সালের ৩ জুনের সংবাদ প্রচার করা হয়েছে; যা বিভ্রান্তিকর।

তথ্যসূত্র

Bangla Tribune – পটুয়াখালীর পর কয়লা সংকটে মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র

Share: