মে মাসে ৩৮৩ ভুল তথ্য শনাক্ত

চলতি বছরের মে মাসে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৩৮৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে ৩৫৫টি প্রতিবেদনের মাধ্যমে এসব ভুল তথ্যের ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করা হয়েছে।

বিশ্লেষণ বলছে, মে মাসে রাজনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি (২৩৪) ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে, যা মোট ভুল তথ্যের প্রায় ৬১ শতাংশ। এছাড়া জাতীয় বিষয়ে ৫২টি, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ৫১টি, খেলাধুলা বিষয়ে ৩টি, ধর্মীয় বিষয়ে ১৪টি, বিনোদন বিষয়ে ১০টি এবং শিক্ষা বিষয়ে ৮টি ও প্রতারণা বিষয়ে ৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে গত মাসে।

এসব ঘটনায় তথ্য কেন্দ্রিক ভুলই ছিল সবচেয়ে বেশি, ১৯৫টি। এছাড়া ভিডিও কেন্দ্রিক ভুল ছিল ১১৭টি এবং ছবি কেন্দ্রিক ভুল ছিল ৭১টি। শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলোর মধ্যে মিথ্যা হিসেবে ৩১৪টি, বিকৃত ৪০টি, বিভ্রান্তিকর হিসেবে ২৮টি ঘটনাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে।

শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে পুরুষদের জড়িয়ে ভুল তথ্য প্রচার হয়েছে ২২৮টি এবং নারীদের জড়িয়ে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ১৩০টি।

একই সময়ে বয়সের ধরন অনুযায়ী পুরুষ ও নারীদের চারটি করে ভাগে ভাগ করা হয়েছে ভুল তথ্যগুলোকে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরুষদের মধ্যে শিশুদের নিয়ে ৩টি, যুবদের নিয়ে ৮৪টি, মধ্যবয়সীদের নিয়ে ৫৬টি এবং প্রবীণদের নিয়ে ৮৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে।

এছাড়া, নারীদের মধ্যে শিশুদের নিয়ে ১৬টি, যুবদের নিয়ে ৪৯টি, মধ্যবয়সীদের নিয়ে ৩৪টি এবং প্রবীণদের নিয়ে ৩১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে।

প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গত মাসে ফেসবু্কে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে, সংখ্যার হিসেবে যা ৩৪৬টি। এছাড়া ইনস্টাগ্রামে ১০৭টি, ইউটিউবে ৩৯টি, এক্সে ২৩টি, টিকটকে ৬১টি ও থ্রেডসে অন্তত ১৭টি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। ভুল তথ্য প্রচারের তালিকা থেকে বাদ যায়নি দেশের গণমাধ্যমও। ১৯টি ঘটনায় দেশের একাধিক গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার হতে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। দুইটি ঘটনায় ভারতীয় গণমাধ্যমেও বাংলাদেশকে নিয়ে অপতথ্য প্রচার করতে দেখা গেছে।

বাংলাদেশ ও ভারতকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের বিষয়টি গেল বেশ কয়েক মাস ধরে আলোচনায়। মে মাসে ৩৮টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে ৩০টি অপতথ্যই বাংলাদেশি পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বিএনপি সরকারকে জড়িয়ে গত মাসে ৫০টি অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার, যার প্রায় ৯২ শতাংশ ক্ষেত্রেই সরকারকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে জড়িয়ে ১৮টি অপতথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার, যার প্রায় ৮৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মে মাসে বিএনপি সরকারের মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ে ১৭টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি (১০টি, সবগুলোতেই নেতিবাচক উপস্থাপন) শিকার হয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ৷

রিউমর স্ক্যানার মে মাসের ফ্যাক্টচেকগুলো বিশ্লেষণে দেখেছে, এই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ৪৫টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে বিএনপিকে জড়িয়ে ১২টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৯২ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। একই সময়ে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জড়িয়ে একটি অপতথ্য (নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া, ছাত্রদলকে জড়িয়ে এই সময়ে ৯টি ও যুবদলকে জড়িয়ে ১টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে মে মাসে ৩৫টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতকে জড়িয়ে ১২টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসবের প্রায় ৯২ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। একই সময়ে দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে ৮টি অপতথ্য (৮৭.৫ শতাংশই নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া, ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে এই সময়ে ৩টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।

এছাড়া, মে মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও দলটির নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ৫৪টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে দল হিসেবে এনসিপিকে জড়িয়ে তিনটি অপতথ্য (সবগুলোই নেতিবাচক) প্রচার হতে দেখা যায়। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জড়িয়ে সাতটি অপতথ্য (সবগুলোই নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গ-ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের নিয়ে মে মাসে ৮৭টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে জড়িয়ে ২৮টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৮৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটির পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে এই সময়ে ২৯টি অপতথ্য (প্রায় ৭৬ শতাংশই ইতিবাচক) প্রচারের প্রমাণ মিলেছে।

মে মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে আটটি ভুল তথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশকে জড়িয়েও সমপরিমাণ ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।

মে মাসে শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে ৫৬টি। এর মধ্যে ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে একটি।

মে মাসে দেশে ৮টি ঘটনা বা ইস্যুতে ভুল তথ্যের প্রচার ছিল। এর মধ্যে ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন ইস্যুতে ৪৪টি, হাম ইস্যুতে ২৬টি, রামিসা হত্যা ইস্যুতে ১৪টি, ধর্ষণ ইস্যুতে ৯টি, রূপপুরে চুল্লিতে ইউরেনিয়াম ব্যবহার শুরুর ইস্যুতে ৭টি, ঈদ ঘিরে ৫টি এবং প্রশ্ন ফাঁস ও চট্টগ্রামে জুলাই গ্রাফিতি সংক্রান্ত ইস্যুতে ২টি করে ভুল তথ্যের প্রচার ছিল।

গণমাধ্যমের নাম, লোগো, শিরোনাম এবং নকল ও ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে ভুল তথ্য প্রচারের পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পেতে দেখা যাচ্ছে৷ মে মাসে এই পদ্ধতির ব্যবহার করে ৪৪টি ঘটনায় দেশ-বিদেশি ১৫টি সংবাদমাধ্যমকে জড়িয়ে ৪৪টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।

বার্তা প্রেরক

তানভীর মাহতাব আবীর

সিনিয়র ফ্যাক্টচেকার,

রিউমর স্ক্যানার বাংলাদেশ।

[email protected]

Share: