নেই তথ্যপ্রমাণ, অনির্ভরযোগ্য পোর্টালের বরাতে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে রূপপুর প্রকল্পের অর্থ লোপাটের খবর গণমাধ্যমে

গত ২০২৪ সালের আগস্টে দেশিয় নানা গণমাধ্যমে দাবি প্রচার করা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিক মালয়েশিয়ার ব্যাংকের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার বা ৫০০ কোটি ডলার আত্মসাৎ করেছেন, টাকার অংকে যা প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। এক্ষেত্রে সূত্র হিসেবে গ্লোবাল ডিফেন্স করপোরেশন নামের এক পোর্টালের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে কড়া নিরাপত্তায় গত ২৮ এপ্রিল পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়ামের ব্যবহার শুরু হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে কিছু গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রতি আবারও একই দাবি প্রচার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে ‘গ্লোবাল ডিফেন্স কর্প’ নামের একটি পোর্টালে ২০২৪ সালের ১৭ আগস্টে ‘Ousted Bangladesh’s Prime Minister Sheikh Hasina, Her Son Sajeeb Wazed Joy And Niece Tulip Siddiq Embezlled $5 Billion From Overpriced $12.65 Billion Rooppur Nuclear Power Plant Through Malaysian Banks’ শিরোনামে প্রচারিত মূল প্রতিবেদনটি পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ‘মিডিয়া প্রচারণার চাকচিক্যের আড়ালে, শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের সদস্যরা রাশিয়ার রোসাটমের কাছ থেকে সোভিয়েত আমলের পারমাণবিক রিয়াক্টর কেনার জন্য ‘কিকব্যাক’ বা কমিশন হিসেবে ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করে এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প থেকে লাভবান হয়েছেন। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে আকাশচুম্বী ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা রাশিয়ার বিভিন্ন গোপন তহবিল থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে এই ৫ বিলিয়ন ডলার পাচারে রাশিয়া সহায়তা করেছিল।’ (অনূদিত) এছাড়াও, দাবি করা হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে টিউলিপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন৷ বিনিময়ে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে তার খালা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে মাসিক ‘সম্মানী’ টিউলিপ পেয়ে আসছেন, তার পাশাপাশি টিউলিপের মা শেখ রেহানা এবং বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য রুশদের কাছ থেকে ৩০ শতাংশ ‘কিকব্যাক’ বা কমিশন পেয়েছেন এবং এই সম্পূর্ণ অর্থ গোপনে বেশ কিছু অফশোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়েছে।

এছাড়াও, প্রতিবেদনে টিউলিপ সিদ্দিক ও শেখ হাসিনার নানা রাজনৈতিক ও পারিবারিক ইতিহাসের বিষয়ে লেখা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে কোথাও উক্ত ৫ বিলিয়ন ডলার, ৩০ শতাংশ এরূপ সুনির্দিষ্ট অঙ্কের সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ বা কোনোরকমের স্টেটমেন্ট, ফাঁস হওয়া নথি বা এরূপ কোনোকিছুরই উল্লেখ বা সংযুক্তি পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, প্রতিবেদন লেখক উক্ত সুনির্দিষ্ট অঙ্ক কোথায় পেয়েছেন তার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দেওয়া হয়নি।

পোর্টালটি পর্যবেক্ষণ করলে তাতে কেবল পোর্টালের প্রতিষ্ঠা সাল হিসেবে ২০১৮ সাল ছাড়া এটির মালিক, সম্পাদকীয় পর্যদ বা স্বচ্ছতা সংক্রান্ত কোনো তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়নি যা একটি পোর্টালের নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে বেমানান।

পোর্টালটির ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করলে তাতে মাত্র ৪৮০ জন ফলোয়ার এবং এক্স অ্যাকাউন্টে প্রায় ১৮০০ জন ফলোয়ার দেখা যায়। উল্লেখ্য যে কম ফলোয়ার মানেই কম নির্ভরযোগ্য এমনটা সবক্ষেত্রে না হলেও ফলোয়ার সংখ্যা একটি পোর্টালের জনপ্রিয়তা বা পরিচিতির সপক্ষে মোটামুটি একটি ধারণা দেয়। এবং এ থেকে স্পষ্ট যে আলোচিত পোর্টালটি বৈশ্বিকভাবে তেমন কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত বা পরিচিত প্ল্যাটফর্ম নয়।

পোর্টালটি পর্যবেক্ষণ করলে তাতে বাংলাদেশের নানা ব্যক্তিবর্গ সম্বন্ধে নানাসময়ে প্রচারিত নানা তথাকথিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এসব প্রতিবেদনগুলোর শিরোনাম বেশ চটকদার। একটি প্রতিবেদনের শিরোনামে লেখা হয়েছে, ‘এপস্টিন ফাইল প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের বরাতে দাবি করা হচ্ছে যে, স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা এবং নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে রোমান্টিক সম্পর্ক থাকতে পারে।’ (অনূদিত) কিন্তু দেশিয় কোনো মূলধারার গণমাধ্যমে এরূপ দাবি পাওয়া যায়নি। পোর্টালটিতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী নিয়ে লেখা নানা প্রতিবেদনের শিরোনামে সরাসরি ‘Thief’ (চোর) শব্দ লেখা হয়েছে। সম্প্রতি সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের বলা ‘চট্টগ্রামে পর্যাপ্ত বিমান শক্তি থাকলে হয়ত রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টি হতো না’ এরূপ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে উক্ত পোর্টালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে শিরোনামে সেনাপ্রধানের নামের পাশে সরাসরি ‘thief’ (চোর) শব্দ লেখা হয়েছে। লেখা হয়েছে, Rohingya crisis might not have arisen if there was sufficient air power in Chittagong: Bangladesh Army Chief (thief) said. এছাড়াও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজকে নিয়ে একটি প্রতিবেদনেও শিরোনামে আজিজের নামের পাশে চোর লেখা হয়েছে, তবে তাতে বানানেও ভুল করা হয়েছে। ‘Thief’ এর বদলে ‘theif’ লেখা হয়েছে। এরূপ নানা প্রতিবেদনে কোনোরকম তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই নামের পাশে ব্র্যাকেটে চোর লেখা হয়েছে যা কোনো পেশাদার সংবাদমাধ্যমে দেখা যায়না।

এদিকে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্টে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ৫ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার ঘুষ দেওয়া হয়েছিল, এমন খবরকে ‘গুজব’ ও ‘মিথ্যা’ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার মান্টিটস্কি। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার মান্টিটস্কি সেসময় বলেন, ‘চিন্তা করুন, ৫০০ কোটি ডলার, এটি বিশাল অঙ্ক। যখন প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলছে, তখন কাউকে এ বিশাল অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়েছে, এটি কীভাবে সম্ভব? গত নির্বাচনের আগে থেকে এমন কথা ছড়ানো হচ্ছে। রাশিয়া, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হেয় করার জন্য এ ধরনের অভিযোগ করা হচ্ছে।’

আলোচিত দাবির বিষয়ে ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে রোসাটম এই অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল বলেও জানা যায়। রোসাটমের বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, “রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত উসকানিমূলক খবরগুলো রোসাটম প্রত্যাখ্যান করছে। আমরা স্বচ্ছ কার্যপদ্ধতি, কঠোর দুর্নীতিবিরোধী নীতি এবং সমস্ত ক্রয় প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ত থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প থেকে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার লোপাটের আলোচিত অভিযোগের বিষয়ে দুদকও (দুর্নীতি দমন কমিশন) অনুসন্ধান করছে। তবে গত ২৯ এপ্রিলে মূলধারার সংবাদমাধ্যম যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, তদন্তের প্রায় দেড় বছর পার হয়ে গেলেও অনুসন্ধান দল এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি। দুদক সংশ্লিষ্টদের দাবি-বর্তমানে কমিশন না থাকায় দুদকের সব কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

তবে নানাসময়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির অভিযোগ গণমাধ্যম সূত্রে সামনে এসেছে যার মধ্যে বেশ আলোচিত বালিশকান্ড রয়েছে। প্রতিটি বালিশ কিনতে খরচ দেখানো হয়েছে ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা। আর প্রতিটি বালিশ আবাসিক ভবনের খাটে তোলার মজুরি দেখানো হয়েছে ৭৬০ টাকা। কভারসহ কমফোর্টারের (লেপ বা কম্বলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত) দাম ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৮০০ টাকা। এছাড়া, প্রকল্পে ‘নিয়োগে অনিয়ম’ এর অভিযোগ তদন্তের আদেশ আদালতকে দিতে দেখা যায়।

অর্থাৎ, উপরোক্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট যে আলোচিত দাবির সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ নেই এবং আলোচিত দাবি প্রচার করা পোর্টাল গ্লোবাল ডিফেন্স কর্প একটি অবিশ্বস্ত পোর্টাল।

তথ্যসূত্র

Share: