রিউমর স্ক্যানারের ৬ বছর: অপতথ্যের বিবর্তনে নিরন্তর লড়াই

ডিজিটাল যুগে তথ্যের প্রবাহ যেমন দ্রুততর হয়েছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অপতথ্যের বিস্তারও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম-নির্ভর পরিবেশে একটি ভুয়া ছবি, বিকৃত ভিডিও কিংবা প্রসঙ্গবিহীন দাবি মুহূর্তেই পৌঁছে যায় লাখো মানুষের কাছে। ফলে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের আগেই অনেক সময় এসব তথ্য জনমতকে প্রভাবিত করে, তৈরি করে বিভ্রান্তি। এমন বাস্তবতায় তথ্য যাচাই ও অপতথ্য প্রতিরোধের কাজটি হয়ে উঠেছে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২০ সালে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীন ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। গত ছয় বছরে রিউমর স্ক্যানার কেবল ভুল কিংবা অপতথ্য শনাক্ত করেই থেমে থাকেনি; বরং অপতথ্যের ধরণ, কৌশল ও বিস্তারের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে জনসচেতনতা তৈরির কাজও করে এসেছে। নির্বাচন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কিংবা সমসাময়িক নানা ঘটনাকে ঘিরে ছড়ানো প্রায় ১২ হাজারেরও বেশি ভুয়া তথ্য যাচাই করে সত্য তুলে ধরার এই নিরন্তর চেষ্টার মধ্যেই ১৭ মার্চ ৭ বছরে পা রাখছে দেশের সবচেয়ে বড় এই তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ।

বদলেছে ধরণ, বেড়েছে অপতথ্যের পরিমাণ

২০২০ সালে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সারাবিশ্বকেই যখন ভাবনায় ফেলছিল, তখন গুজবও ছাড়ছিল না এই ভাইরাসের পিছু। লকডাউনের দিনগুলোতে ডিজিটাল দুনিয়ায় করোনা সংক্রান্ত নানা অপতথ্যের বিস্তার মানুষকে বিভ্রান্ত করে তুলছিল। এমনই এক প্রেক্ষাপটে রিউমর স্ক্যানারের পথচলা শুরু। শুরুর দিকে অপতথ্যের বড় অংশই ছিল পুরোনো বা ভিন্ন দেশের ছবি–ভিডিও নতুন দাবি দিয়ে প্রচার। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার ছবি বাংলাদেশে ঘটেছে বলে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। বিশেষ করে ধর্মীয় ইস্যু বা সহিংসতার ঘটনার সময় এসব কনটেন্ট দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ত এবং অল্প সময়ের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করত। তবে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক ছিল স্বাস্থ্য বিষয়ক অপতথ্য; করোনা নিরাময়ে ‘থানকুনি পাতা’ খাওয়ার মতো অবৈজ্ঞানিক টোটকা তখন ভাইরাল হচ্ছিল। সে সময় বাংলাদেশের প্রথম ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওয়েব কন্টেন্টের পাশাপাশি ফেসবুকে ডিজিটাল ব্যানারের মাধ্যমে ফ্যাক্ট চেক ব্যানার প্রকাশ করা শুরু করে রিউমর স্ক্যানার। উদ্দেশ্য একটাই, দ্রুততম সময়ের মধ্যে মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া। গত ৬ বছরে কেবল ফেসবুকেই এমন প্রায় ২৩০০টি ফ্যাক্টচেক ব্যানার প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০২১ সালে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এক নতুন ধরনের প্রতারণার কৌশলের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়—যেখানে অসুস্থ শিশুর করুণ ছবি, আবেগঘন ক্যাপশন এবং মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর ব্যবহার করে সাহায্যের আবেদন জানানো হতো। ‘রিউমর স্ক্যানার’ সে বছর এই ধরনের অসংখ্য পোস্টের সত্যতা যাচাই করে। দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই ভারতীয় শিশুদের পুরোনো ছবি ব্যবহার করে ভুয়া গল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সরলতা ও সহানুভূতিকে পুঁজি করে আর্থিক প্রতারণা করা হচ্ছে। যদিও পরবর্তী বছরগুলোতেও এই অসাধু চক্র সক্রিয় ছিল, তবে ফ্যাক্টচেকারদের নিরলস প্রচেষ্টা ও নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণার ফলে বর্তমানে এই পদ্ধতিতে প্রতারণার হার অনেকটাই কমে এসেছে।

২০২২ সাল এক ঘটনাবহুল বছর হিসেবে ধরা দেয়। দেশে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন, দেশের বাইরে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, খেলাধুলায় ফুটবল বিশ্বকাপ এমন নানা ঘটনাপ্রবাহ সংক্রান্ত ভুল তথ্য শনাক্ত করা ছাড়াও রিউমর স্ক্যানার সমাজের গভীরে গেঁথে থাকা নানা ‘মিথ’ বা প্রচলিত ভুল ধারণা ভাঙতেও অনন্য ভূমিকা পালন করে। খাদ্যে টেস্টিং সল্টের প্রভাব, পরীক্ষার আগে ডিম খাওয়া নিয়ে কুসংস্কার কিংবা নবজাতককে মধু খাওয়ানোর মতো ২০টিরও বেশি সংবেদনশীল বিষয়ে বিজ্ঞানসম্মত ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি। একই বছর ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ‘রিউমর স্ক্যানার’ পাঠ্যবইয়ে থাকা ভুলের বিষয়ে ফ্যাক্টচেক করা শুরু করে।

২০২৩ সাল ছিল রাজনৈতিক উত্তাপের এক বছর। বিশেষ করে, পরের বছরের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সে বছরের ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশ করে বিএনপি। এই কর্মসূচি ঘিরে রিউমর স্ক্যানার ৪০টি ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে ২৫টিতেই ভুল তথ্য ছড়াতে একাধিক গণমাধ্যমকে ব্যবহার করা হয়েছে। সেবারই প্রথম কোনো ইস্যুতে গণমাধ্যমের নকল ফটোকার্ডের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। মূলত ২০২৩ সাল থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্যের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে এই ভুয়া ফটোকার্ডের আধিপত্য শুরু হয়।

২০২৪ সালের শুরুটা হয়েছিল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিয়ে। এই নির্বাচনেই প্রথমবারের মতো ডিপফেক ভিডিও ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া যায়। বছরের মধ্যভাগে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দানা বাঁধা ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এই ক্ষমতার পালাবদলের সন্ধিক্ষণে দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে অপতথ্যের এক নতুন জোয়ার শুরু হয়। বিশেষ করে ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে একের পর এক উসকানিমূলক সাম্প্রদায়িক প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হতে থাকে। একই সাথে সে বছর অপতথ্যের নতুন দুটি ধরন জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়—একটি হলো সেলিব্রিটিদের কৃত্রিম কণ্ঠ ও ছবি ব্যবহার করে অনলাইন জুয়ার ভুয়া বিজ্ঞাপন এবং অন্যটি হলো ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা।

২০২৫ সালে অপতথ্যের জগতে যেন এক ‘এআই বিপ্লব’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কনটেন্টের একচ্ছত্র আধিপত্য লক্ষ্য করা যায়। এআই প্রযুক্তির কল্যাণে তৈরি করা বা সম্পাদিত ছবি ও ভিডিওগুলো এখন এতটাই বাস্তবসম্মত যে, খালি চোখে সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এআই কনটেন্টের ব্যাপক অপব্যবহার দেখা গেছে। এর পাশাপাশি অপপ্রচারের চিরচেনা কৌশলগুলোও আরও সূক্ষ্ম হয়ে উঠেছে—যেমন রাজনীতিবিদদের বক্তব্যের অংশবিশেষ কেটে (Context out of context) ভিন্ন অর্থ তৈরি করা, ছবির নির্দিষ্ট অংশ ডিজিটাল কারসাজিতে বদলে দেওয়া কিংবা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো ঘটনার ভিডিওকে নতুন ঘটনার দাবি দিয়ে প্রচার করা। সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল ছিল সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য চেনার ক্ষেত্রে ডিজিটাল ইতিহাসের অন্যতম কঠিন এক সময়।

গত এক বছরে অপতথ্য ছড়ানোর কৌশলে যুক্ত হয়েছে এক নতুন মাত্রা—ফেসবুকের অসংখ্য ‘সার্কাজম’ বা বিদ্রুপাত্মক পেজ। রসিকতার ছলে তৈরি করা এসব কনটেন্ট চলতি ২০২৬ সালেও একইভাবে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই প্রবণতাটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।

এসব পেজের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, তারা তাদের পোস্টগুলোতে কোনো ধরনের ‘ডিসক্লেইমার’ বা সতর্কবার্তা দিচ্ছে না। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা রম্য বা বিদ্রূপ হিসেবে তৈরি করা এসব পোস্টকে বাস্তব সংবাদ হিসেবে গ্রহণ করে শেয়ার করছেন, যা মুহূর্তেই বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করছে। বর্তমানে ভুয়া ফটোকার্ড ও এআই প্রযুক্তির অপব্যবহারের পাশাপাশি ‘সার্কাজম কনটেন্ট’ এখন ডিজিটাল দুনিয়ায় সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এক নতুন ও জটিল উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য ছড়িয়ে পড়ার গতি যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে অপতথ্যের বিস্তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া নানা দাবি, ছবি ও ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে গত ৬ বছরে অপতথ্যের ধরণে বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। শুরুতে যেখানে পুরোনো ছবি বা ভিডিও নতুন দাবি দিয়ে ছড়ানো ছিল সবচেয়ে সাধারণ কৌশল, সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভুয়া ফটোকার্ড, বিভ্রান্তিকর সম্পাদনা এবং হাল আমলের এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও এবং সার্কাজম কনটেন্টের মাধ্যমে অপতথ্য ছড়িয়ে দেওয়া। ফলে অপতথ্য এখন শুধু সংখ্যায় নয়, প্রযুক্তিগত জটিলতার দিক থেকেও নতুন মাত্রা পেয়েছে।

অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু: রাজনীতি, ধর্ম ও নারীরা এগিয়ে

গত ছয় বছরে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্যের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কিছু নির্দিষ্ট বিষয়কে ঘিরেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি ও প্রচার করা হয়েছে। এসব বিষয় সাধারণত জনমতকে দ্রুত প্রভাবিত করতে পারে বা মানুষের আবেগকে সহজেই স্পর্শ করে—ফলে সেগুলোকে লক্ষ্য করে অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

রাজনীতি ও নির্বাচন বিষয়টি অপতথ্যের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যগুলোর একটি। নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থী, রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য বিকৃত করে প্রচার করা, ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করা কিংবা পুরোনো ছবি–ভিডিও নতুন দাবি দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা নিয়মিত দেখা গেছে। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় বা রাজনৈতিক উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে এ ধরনের অপতথ্যের প্রবাহ হঠাৎ বেড়ে যায়, যা ভোটারদের বিভ্রান্ত করা বা জনমত প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ছড়ানো হয়।

ধর্মীয় ইস্যু নিয়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপতথ্য ছড়ানো হয়। বিশেষ করে ভারতীয় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট এবং দেশটির গণমাধ্যমগুলোকে এক্ষেত্রে বড় ভূমিকায় দেখা যায়। ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে জড়িত হওয়ায় এসব কনটেন্ট দ্রুত ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো বা ভিন্ন দেশের ঘটনা নতুন করে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়, আবার কখনও ভুয়া বক্তব্য বা বিকৃত ছবি–ভিডিও ব্যবহার করে ধর্মীয় উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করা হয়।

অপতথ্যের আরেকটি বড় লক্ষ্যবস্তু নারী ও সেলিব্রিটি। শোবিজের নারী, নারী রাজনীতিবিদ বা আলোচিত নারী ব্যক্তিত্বদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া খবর, ভুয়া ফটোকার্ড বা বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়ানোর ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। অনেক সময় তাদের বক্তব্য বিকৃত করা হয়, আবার কখনও এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পাদিত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা সামাজিকভাবে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়।

এছাড়া আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি ঘিরেও অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা দেখা যায় বিগত বছরগুলোয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংঘাত, নির্বাচন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আলোচিত কোনো ঘটনার ছবি–ভিডিও প্রায়ই ভুল প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করে বা ভিন্ন দাবি দিয়ে প্রচার করা হয়। আন্তর্জাতিক ঘটনার ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই না করেই সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করার প্রবণতাও এসব অপতথ্যের বিস্তার বাড়িয়ে দেয়। সাধারণ মানুষ যখন মূলধারার গণমাধ্যমের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর বেশি নির্ভর করে, তখনই এই আন্তর্জাতিক অপতথ্যগুলো মানুষের বিশ্বদর্শনকে ভুল পথে পরিচালিত করে।

বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, আলোচিত কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘটনার সময় অপতথ্যের প্রবাহ হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। বড় কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে নানা দাবি, ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যার একটি বড় অংশই যাচাইবিহীন বা বিভ্রান্তিকর। দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে পড়ার এই পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে অপতথ্য সৃষ্টিকারীরা নতুন নতুন কনটেন্ট তৈরি করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করে।

ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপতথ্য মোকাবিলায় তথ্য যাচাই, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দায়িত্বশীলভাবে তথ্য শেয়ার করার গুরুত্ব আরও বেশি করে সামনে এসেছে।

নানা উদ্যোগে অপতথ্য মোকাবিলার চেষ্টা

গত ছয় বছরে সময়ের সাথে অপতথ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকায় অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নানা উদ্যোগ নিতে হয়েছে রিউমর স্ক্যানারকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি, কনটেন্ট উপস্থাপন এবং দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেওয়ার কৌশলেও আনা হয়েছে নানা পরিবর্তন। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু অপতথ্য শনাক্তই নয়, বরং পাঠকদের কাছে যাচাইকৃত তথ্য সহজভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে ফ্যাক্টচেক – এই ফরমেটটি ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে সাধারণ উপায় হলেও এমন অনেক বিষয় বা দাবি থাকে যা যাতে বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়, প্রথাগত ফরমেটে তখন তা বোঝানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই ভাবনা থেকেই ফ্যাক্টফাইল ও ফ্যাক্টস্টোরি সেকশন চালু করে রিউমর স্ক্যানার। এর সাথে যুক্ত হয়েছে রিউমর স্ক্যানারের ইনভেস্টিগেশন ইউনিট (আই ইউনিট)। বড় কোনো ঘটনা বা দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে অপতথ্যও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে যাচাইকৃত তথ্য পৌঁছে দিতে চালু করা হয় ওয়েবসাইট লাইভ আপডেট। এতে একই বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন যাচাই যুক্ত করা হয়, যাতে পাঠক একটি জায়গা থেকেই সংশ্লিষ্ট অপতথ্য ও তার সত্যতা সম্পর্কে আপডেট জানতে পারেন। বিশেষ করে নির্বাচন, বড় দুর্ঘটনা বা আলোচিত রাজনৈতিক ঘটনার সময় এই ফরম্যাটটি বেশি ব্যবহৃত হয়। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে রিউমর স্ক্যানার শুধু অপতথ্য শনাক্ত করাই নয়, বরং তথ্য যাচাইকে আরও পদ্ধতিগত ও পাঠকবান্ধব করে তোলার চেষ্টা করে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন কৌশল ও প্রযুক্তি যুক্ত করে এই কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করার প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপতথ্যের ধরণও বদলেছে—ফটোকার্ড থেকে সার্কাজম কনটেন্ট, ভুয়া ছবি-ভিডিও থেকে এআই-নির্ভর কনটেন্ট। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে ফ্যাক্টচেকিং কার্যক্রম। তবু প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের ভেতরেই সত্য অনুসন্ধানের কাজ চালিয়ে গেছে রিউমর স্ক্যানার। ছয় বছরের এই পথচলা তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের গল্প নয়; বরং ডিজিটাল যুগে অপতথ্যের বিবর্তনের বিপরীতে নিরন্তর লড়াইয়েরও গল্প।

Share: