সৌদি যুবরাজ কাবা শরীফে সাঈদীর গায়েবানা জানাজার অনুমোদন দেননি

সম্প্রতি ‘আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর গায়েবানা জানাজা কাবা শরীফে পড়ার অনুমোদন।’ শীর্ষক শিরোনামে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের বক্তব্য দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে।

ফেসবুকে প্রচারিত কিছু পোস্ট দেখুন পোস্ট (আর্কাইভ), পোস্ট (আর্কাইভ), পোস্ট (আর্কাইভ), পোস্ট (আর্কাইভ), পোস্ট (আর্কাইভ)।

টিকটকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন- পোস্ট (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, কাবা শরীফে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর গায়েবানা জানাজা পড়ার অনুমোদন দেওয়ার দাবিটি সঠিক নয় বরং গত জুলাইতে Gulf Cooperation Council (GCC & CA) সামিটে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের বক্তব্যের একটি খন্ডিত অংশকে ব্যবহার করে উক্ত দাবিটি প্রচার করা হচ্ছে।

ভিডিওটি নিয়ে অনুসন্ধানে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের প্রচারিত ভিডিওটির ব্যাকগ্রাউণ্ডে ‘GCC… Summit’ শীর্ষক একটি লেখা খুঁজে পাওয়া যায়।

এই লেখার সূত্রে কি-ওয়ার্ড অনুসন্ধানের মাধ্যমে ইউটিউবের Saudi Arabian News নামের একটি চ্যানেলে গত ১৯ জুলাই ‘Saudi Crown Prince Mohammed bin Salman full speech at AlUla GCC Summit 19 July 2023 on wenesday.’ শীর্ষক শিরোনামে প্রচারিত একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়।

০২ মিনিট ১০ সেকেন্ডের ইউটিউবের এই ভিডিওটির ২০ সেকেন্ড থেকে ৩১ সেকেন্ড পর্যন্ত ফুটেজের সাথে কাবা শরীফে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর গায়েবানা জানাজা পড়ার অনুমোদন দেওয়ার দাবিতে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের প্রচারিত ভিডিওটির বক্তব্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক গণমাধ্যম Al Arabiya News এ ১৯ জুলাই ‘Saudi Crown Prince declares adoption of decisions issued by GCC-Central Asia summit’ শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের বক্তব্যের সারমর্ম খুঁজে পাওয়া যায়।

সামিটে মুহাম্মদ বিন সালমান চলমান বিশ্বের নানা চ্যালেঞ্জ সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলকে প্রভাবিত করে এমন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রচেষ্টা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার উপর আলোকপাত করেন।

পাশাপাশি সামিটে তিনি বিভিন্ন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতাকে সম্মান করার এবং অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার প্রয়োজনীয়তার উপরও জোর দেন।

এই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে সৌদি যুবরাজ কর্তৃক দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কিংবা অন্য কারো জন্য কাবা শরীফে গায়েবানা জানাজা পড়ার অনুমোদন দেওয়ার কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তাছাড়া, সাঈদীর মৃত্যু হয়েছে গত ১৪ আগস্ট। তাই ১৯ জুলাইয়ের উক্ত সামিটে জানাজার বিষয়টি আসা অমূলক।

এছাড়া প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন কি-ওয়ার্ড অনুসন্ধান করেও সৌদি যুবরাজ কর্তৃক কাবায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ কারো গায়েবানা জানাজা পড়ার অনুমোদন দেওয়া প্রসঙ্গে কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বরং অনুসন্ধানে দেখা যায়, কাবা শরীফসহ মসজিদে নববীতে গায়েবানা জানাজা পড়ার বিষয়ে মসজিদ দুইটির তত্ত্বাবধায়ক সৌদি বাদশাহ সিদ্ধান্ত দেওয়ার রীতি রয়েছে। এ সংক্রান্ত কিছু প্রতিবেদন দেখুন এখানে, এখানে

উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে পৃথিবীর ইতিহাসে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে কাবায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর গায়েবানা জানাজা পড়ার একটি দাবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিল। তবে এ নিয়ে রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, কাবা শরীফে নিয়মিতই মৃত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নাম ঘোষণা পূর্বক গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

এ নিয়ে বিস্তারিত ফ্যাক্টচেক দেখুন তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে কাবায় সাঈদীর গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার দাবিটি মিথ্যা

মূলত, গত ১৪ আগস্ট মারা যাওয়া যুদ্ধাপরাধের দায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর গায়েবানা জানাজা কাবা শরীফে পড়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে শীর্ষক দাবি করে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের বক্তব্য দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু রিউমর স্ক্যানার টিম অনুসন্ধান করে দেখেছে, উক্ত দাবিটি সঠিক নয়। গত ১৯ জুলাই সৌদি আরবের জেদ্দায় উপসাগরীয় ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে GCC-Central Asia Summit অনুষ্ঠিত হয়। এই সামিটে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের দেওয়া একটি বক্তব্য থেকে ১৫ সেকেন্ডের একটি ফুটেজ কেটে নিয়ে উক্ত দাবিটি প্রচার করা হচ্ছে। উক্ত সামিটে দেওয়া সৌদি যুবরাজের বক্তব্যে এমন কোনো বিষয় ছিল না। তাছাড়া, পরবর্তীতে সৌদি যুবরাজ এমন কোনো অনুমোদন দিয়েছেন মর্মে কোনো তথ্য গণমাধ্যমে উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত, জামায়াতে ইসলামীর হয়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে পর পর দুইবার বাংলাদেশের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। ২০১০ সালের ২৯শে জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগের একটি মামলায় তিনি গ্রেফতার হন। পরে ২ আগস্ট এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরপর থেকেই কারাগারে ছিলেন জামায়াতের এই নেতা। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে আনা মোট বিশটি অভিযোগের মধ্যে আটটিতে তিনি আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দুটো অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে আদালত ২০১৩ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়। তবে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে ২০১৪ সালে আপীল বিভাগ সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়। দণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনা চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও সাঈদীর পৃথক রিভিউ আবেদন খারিজ করে ২০১৭ সালের ১৫ মে আমৃত্যু কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়। এরপর থেকে কারাগারে থেকেই সাজা ভোগ করছিলেন তিনি।

সুতরাং, আন্তর্জাতিক একটি সম্মেলনে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের দেওয়া পুরোনো বক্তব্যের অংশকে কাবা শরীফে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর গায়েবানা জানাজা পড়ার অনুমোদন দিয়ে মুহাম্মদ বিন সালমান বক্তব্য দিচ্ছেন দাবিতে ইন্টারনেটে প্রচার করা হচ্ছে; যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: