২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর তিনি বিভিন্ন সময় অডিও কলে নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ইমেইলের মাধ্যমে ভারতসহ আন্তর্জাতিক কয়েকটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তবে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দেননি।
এদিকে, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
এই প্রেক্ষাপটে, হাদি ইস্যুতে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে শেখ হাসিনা বক্তব্য দিয়েছেন দাবিতে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটিতে শেখ হাসিনার কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, ‘প্রিয় দেশবাসী, আজকে অত্যন্ত বেদনা-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো কিছু মহল এই আন্দোলনের সুযোগটা নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। এর ফলে যে সকল ঘটনা ঘটেছে তা খুবই বেদনাদায়ক ও দুঃখজনক। পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। আমি প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাই।’

উক্ত দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন: এখানে, এখানে, এখানে।
একই দাবিতে ইউটিউবে প্রচারিত ভিডিও দেখুন: এখানে।
টিকটকে প্রচারিত একই দাবি দেখুন: এখানে।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচিত ভিডিওটি শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে শেখ হাসিনার দেওয়া কোনো বক্তব্যের নয়। প্রকৃতপক্ষে, এটি ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া শেখ হাসিনার ভাষণের ভিডিও।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভির ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওটির বিবরণ থেকে জানা যায়, এটি সে সময় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া শেখ হাসিনার বক্তব্য। যমুনা টিভির ভিডিওটির সঙ্গে আলোচিত ভিডিওতে শেখ হাসিনার পরিহিত পোশাক ও ব্যাজের মিল রয়েছে।
তবে, দাবিকৃত ভিডিওতে শেখ হাসিনার পেছনে ভারতীয় পতাকা সংবলিত একটি ব্যাকগ্রাউন্ড দেখা গেলেও যমুনা টিভির ভিডিওতে ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে। কিন্তু যমুনা টিভির ভিডিওর বিভিন্ন অংশে শেখ হাসিনাকে দাবিকৃত ভিডিওতে দেওয়া বক্তব্য বলতে শোনা যায়।

আরও অনুসন্ধানে সিলেটভিত্তিক গণমাধ্যম সিলেট টুডে ২৪-এর ওয়েবসাইটে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে দেশব্যাপী উদ্ভূত সংঘাতময় পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ১৭ জুলাই জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া শেখ হাসিনার পূর্ণাঙ্গ ভাষণ লিখিত আকারে প্রকাশ করা হয়। সেখানে উল্লিখিত বক্তব্যের সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়।
এছাড়া, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই প্রকাশিত বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদন থেকেও জানা যায়, ১৭ জুলাই শেখ হাসিনার দেওয়া ভাষণ আন্দোলনকারীরা প্রত্যাখ্যান করেন। ওই ভাষণের পর কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’-এর ডাক দেন।
অর্থাৎ, ২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেওয়া শেখ হাসিনার পুরোনো ভাষণের ভিডিও সম্পাদনার মাধ্যমে আলোচিত ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।
এছাড়াও, হাদি ইস্যুতে শেখ হাসিনার ক্ষমা চেয়ে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে বিশ্বস্ত সূত্রে কোনো প্রকার তথ্য পাওয়া যায়নি।
সুতরাং, ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেওয়া শেখ হাসিনার পুরোনো ভাষণের ভিডিও হাদি ইস্যুতে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে বক্তব্য দেওয়ার দাবিতে প্রচার করা হয়েছে; যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তথ্যসূত্র
- Jamuna Tv: জাতির উদ্দেশে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
- Sylhet Today 24: কোটা আন্দোলন: জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পূর্ণ বিবরণ


