দিল্লী বিমানবন্দরের ভেতরের দৃশ্য। “Hajj Pilgrim Departures” (হজযাত্রীদের প্রস্থান) লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। পরিবেশ দেখে বোঝা যাচ্ছে, এটি হজযাত্রীদের যাত্রার জন্য নির্ধারিত একটি টার্মিনাল। ছবির কেন্দ্রে সাদা শাড়ি ও মাথায় ওড়না পরা শেখ হাসিনা দাঁড়িয়ে আছেন। তার গলায় একটি আইডি কার্ড ঝুলছে এবং হাতে তসবিহ ধরা। হাতে ঝোলানো একটি ছোট ব্যাগ রয়েছে, যেখানে “Hajj 2024” লেখা দেখা যায়। এটি ইঙ্গিত করে তিনি হজ পালনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করছেন। কিন্তু ২০২৪ লেখা দেখে খটকা লাগা স্বাভাবিক।
শেখ হাসিনাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছেন চারজন সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী, যারা ক্যামোফ্লাজ ইউনিফর্ম ও কালো বেরেট পরিহিত। পেছনের দিকে আরও কয়েকজন হজযাত্রী দেখা যাচ্ছে, যারা সাদা ইহরাম পোশাক পরা এবং লাগেজসহ এগোচ্ছেন। সবমিলিয়ে, হজযাত্রার একটি পরিবেশ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছবিটিতে। ফেসবুকে ‘শেখ হাসিনা জয় বাংলা’ নামের একটি পেজে ছবিটি রিলস আকারে পোস্ট করে ক্যাপশনে বলা হচ্ছে, “দিল্লি এয়ারপোর্ট থেকে হজ্ব করার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।” এই রিলসটি ২০ এপ্রিল দুপুর ১২ টা পর্যন্ত ২ লক্ষ ১২ হাজার বার দেখা হয়েছে।

ফেসবুকের একাধিক পেজ-গ্রুপসহ (১, ২), টিকটক, ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে ছবিটি রীতিমতো ভাইরাল এখন।
যাচাই করতে গিয়ে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, ছবিটি প্রথম ছড়ায় ‘Riziker rasta – রিজিকের রাস্তা’ নামের একটি পেজ থেকে, যাদের এআই কনটেন্ট কোনো ডিসক্লেইমার না দিয়েই ছড়িয়ে দেওয়ার পূর্ব ইতিহাস রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, এই ছবিটিও এআই দিয়ে তৈরি ভেবে নিয়ে রিউমর স্ক্যানার গুগলের বিশেষ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ‘SynthID’ এর শরণাপন্ন হয়। গুগলের এই প্রযুক্তি এআই দিয়ে তৈরি ছবি, ভিডিও বা অডিওতে অদৃশ্য জলছাপ যুক্ত করে, যা খালি চোখে দেখা না গেলেও গুগলের নিজস্ব টুলের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। ছবিটি সিন্থআইডি দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই ছবিটির পুরো অংশ বা অনেকটা অংশই গুগল এআই ব্যবহার করে তৈরি বা এডিট করা হয়েছে।
শুধু এই ছবিই নয়, শেখ হাসিনার হজযাত্রা দাবিতে দিল্লী বিমানবন্দরের আরো দুইটি ছবি (১, ২) এবং একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে ‘Riziker rasta – রিজিকের রাস্তা’ পেজ থেকে, যা পরবর্তীতে আসল দাবিতে ছড়িয়েছে আওয়ামী পন্থী বিভিন্ন পেজে (১, ২)।

এসব কনটেন্ট যে এআই দিয়ে বানানো তা প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণে সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু এসব পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, অসংখ্য মানুষ এসব কনটেন্টকে বাস্তব ধরে নিয়েছেন, দিচ্ছেন মতামতও। এ সংক্রান্ত একটি পোস্টে Md Abdur Rashid নামে গাজীপুরের ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি লিখেছেন, “ফি আমানিল্লাহ মহান রাব্বুল আলামিন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার হজকে কবুল করুন হজ্জকে কবুল করুন এবং বাংলাদেশের গরীব দুঃখী মেহনতী মানুষের জনগণের ও দেশ ও জাতির কল্যাণে উন্নয়নমূলক কাজ করার তৌফিক দান করুন বর্তমানে দেশে যে পরিস্থিতি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আপনি সবই অবগত আছেন ইনশাআল্লাহ আমরা বাংলার মানুষ শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবার দেখতে চাই ইনশাআল্লাহ দ্রুত কবুল করুন মঞ্জুর করুন।”
২০২৪ সালের ০৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা৷ এরপর কখনও রেকর্ডেড অডিও বার্তা, কখনো-বা লাইভ অডিওতে কথা বলতে দেখা গেছে তাকে। কিন্তু গত প্রায় ২০ মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে কখনোই তার কোনো ছবি বা ভিডিও প্রকাশ্যে আসেনি। আওয়ামী লীগ সমর্থিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অসংখ্য প্ল্যাটফর্মে পুরোনো ছবি-ভিডিও আর এআই কনটেন্টের ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে বরাবরই প্রকাশ্যে দেখা যাওয়ার দাবি তোলা হয়েছে। এসব কনটেন্টের কমেন্টেও বহু মানুষকে সত্য-মিথ্যা যাচাই ছাড়াই কনটেন্টের পক্ষেই মতামত দিতে দেখা গেছে, যা শুধু বিভ্রান্তির স্থায়ী ভিত্তিই দিয়েছে।
শুরুর দিকে এই বিভ্রান্তিকর কনটেন্টগুলোতে পুরোনো ছবি-ভিডিওর ব্যবহারের আধিক্য দেখা যেত। সময়ের সাথে এআই এর ব্যবহার সহজলভ্য হয়ে ওঠার দরুণ এখন হরহামেশাই শেখ হাসিনার প্রকাশ্য উপস্থিতির দাবি তোলা হচ্ছে এআই এর সহায়তা নিয়ে৷ এমনকি ইস্যুভিত্তিক বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহেও প্রযুক্তির এই অপব্যবহার বাড়ছে। এই যেমন এখন হজের মৌসুম চলছে৷ চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে আগামী ২৬ মে পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে এ বছরের প্রথম হজ ফ্লাইটটি যাত্রা করে গত ১৭ এপ্রিল। ভারতেও পরদিন অর্থাৎ, ১৮ এপ্রিল সে দেশের প্রথম হজ ফ্লাইটটি ছেড়ে গেছে দিল্লী থেকে। সেদিনই দুপুরে শেখ হাসিনার আলোচিত ছবিটি ছড়াতে দেখা যায়। ১৯ এপ্রিল সকালে ‘Riziker rasta – রিজিকের রাস্তা’ পেজ থেকে আরেকটি ছবি প্রচার করা হয়। দাবি করা হয়, শেখ হাসিনা সৌদি বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন। বিশ্লেষণ বলছে, এটিও এআই দিয়ে তৈরি হওয়া ছবি।

এই ছবি দিয়ে একই পেজে ভিডিও বানিয়ে প্রচার করা হয়েছে, যা দেখা হয়েছে প্রায় এক লক্ষ বার।
সফরের ধারাবাহিক কার্যক্রম হিসেবে এরপর সৌদি বাদশাহর আমন্ত্রণে শেখ হাসিনার ভোজের দৃশ্য ‘সৌদি বাদশার বিশেষ আমন্ত্রণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শেখ হাসিনা।’ শিরোনাম দিয়ে পোস্ট করা হয়েছে পেজে। এই পোস্টটি ভাইরাল হয়েছে অবশ্য ভিন্ন ক্যাপশনে। একাধিক পেজে ছবিটি দিয়ে বলা হচ্ছে, “সৌদী জুবরাজের আমন্ত্রণে একসঙ্গে খাবার খাচ্ছেন শেখ হাসিনা ! জুবরাজ বলেছেন হাসিনাকে সম্মানের সাথে বাংলাদেশে না ফিরতে দিলে কঠিন পদক্ষেপ দিবে সৌদি সরকার!”

গুগলের জেমিনি জানাচ্ছে, এআই দিয়ে তৈরি ছবিটি বিশ্লেষণে প্রেক্ষাপট, ব্যক্তিদের মুখাবয়ব ও অঙ্গভঙ্গি এবং খাবার ও টেবিলের ডিটেইলস সংক্রান্ত অন্তত অসংগতি চোখে পড়ে।
এরপরই সেই ক্ষণ। কাবা শরীফের সামনে শেখ হাসিনার একাধিক ছবি-ভিডিও (১, ২, ৩) প্রচার হলো পেজটিতে। তিনি অবশ্য একা নন, সাথে দেখা গেল তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে।

যে ভিডিওটি প্রচার করা হচ্ছে, তাতে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, “আসসালামু আলাইকুম। যে যেখান থেকে আমার এই ভিডিওটি দেখছেন তাদের সবাইকে মনের গভীর থেকে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ। আপনারা ইতোমধ্যেই শুনেছেন আমি কিছু নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে পবিত্র হজ পালন করতে আসছি। আমি এই হজের পরই বাংলাদেশে আসবো। মিথ্যা মামলাগুলোর মোকাবিলা করার জন্য। আপনাদের ভালোবাসা আমার সাথেই আছে। তাই আমি কোনো কিছু ভয় করিনা।” যদিও এআই শেখ হাসিনার আসল কণ্ঠ বসাতে পারেনি। কণ্ঠ বদলে যাওয়ায় সহজেই বোঝা যাচ্ছে যান্ত্রিক শব্দের কারসাজিতে ভুয়া এই ভিডিও বানানো হয়েছে। কিন্তু কমেন্ট দেখে তা বোঝার উপায় নেই। একজন লিখেছেন, “আমরা তো নেতা না সেই নেতাদের নিয়ে গেলেন যে নেতারা আপনার দূর সময়ে দাড়ায়নি আপনাকে চলে যেতে যখন বাধ্য করা হচ্ছিল তখন একটা তু সব্দেও করেনি কোন ইনফরমেশনও দেয়নি সেসব নেতাদের নিয়েই আপনি হজ্জে গিয়েছেন,, এতে বুঝা যাই অবহেলিত নেতাকর্মীরা অবহেলায় থাকবে,,?”
শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে—দিল্লি হয়ে হজে মক্কায় পৌঁছেছেন, এমন চমক জাগানো “খবর” ছড়িয়ে পড়ছে এআই-তৈরি ছবি-ভিডিওতে। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই তাতে বিশ্বাস রেখে মত দিচ্ছেন নেটিজেনরা। প্রযুক্তির এই ভেলকিতে বিভ্রান্তির এমন চিত্র, নিঃসন্দেহে সময়ের এক অদ্ভুত প্রতিচ্ছবি।
‘Riziker rasta – রিজিকের রাস্তা’ নামের ফেসবুক পেজটি খোলা হয় ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল। বাংলাদেশ থেকে দুইজন এডমিন পেজটি পরিচালনা করছেন। একই নামে টিকটকেও একটি অ্যাকাউন্ট সক্রিয় রয়েছে। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই পেজ-অ্যাকাউন্ট থেকে নিয়মিত আওয়ামী লীগের পক্ষে নানা এআই কনটেন্ট বানিয়ে প্রচারের নজির পাওয়া গেছে। ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোও এদের ভাইরাল কনটেন্টগুলো নিয়ে কাজ করেছেন। রিউমর স্ক্যানার পেজটির একজন এডমিনের ফেসবুক প্রোফাইল খুঁজে পেয়েছে, যেখানে তিনি গত বছরের ১৪ এপ্রিল পেজটি নতুন খুলেছেন বলে এক পোস্টে জানান।

সোহেল রানা নামের এই ব্যক্তির বাড়ি গোপালগঞ্জে। তার মোবাইল নাম্বারটি যাচাই করে তিনি ঢাকার উত্তর বাড্ডায় একটি ফুডকার্টের প্রোপাইটার বলে জানা যাচ্ছে। রিউমর স্ক্যানারের পক্ষ থেকে মোবাইলের মাধ্যমে তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি এখন আর ঢাকায় থাকেন না। গোপালগঞ্জে একটি বাস কাউন্টারে চাকরি করেন। সোহেল রানার দাবি, তিনি তার কনটেন্টে এআই এর বিষয়টি উল্লেখ করে দেন। আদতে যা সত্য নয়। তিনি রিউমর স্ক্যানারকে জানান, গত তিন মাস ধরে তার এই পেজ থেকে কোনো আয় আসছে না। ক্রমাগত রিপোর্টের কারণে পেজের মনিটাইজেশন চলে গেছে।
ফেসবুক-টিকটকের এমন প্রোফাইল-পেজগুলোতে নিয়মিত এআই-তৈরি কনটেন্ট প্রকাশ করা হলেও কোথাও তা স্পষ্ট করে উল্লেখ না থাকার ফলে কোনো সতর্কতা বা প্রাসঙ্গিক তথ্য ছাড়াই কনটেন্টগুলো দেখে অনেক নেটিজেন সেগুলোকে সত্য বলে ধরে নিচ্ছেন এবং তা আরও ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এ ধরনের এআই-তৈরি কনটেন্টকে সত্য ধরে নেওয়ার ফলে বাস্তবতা ও কল্পনার সীমা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, অপতথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।


