শেখ হাসিনার রায়ের বিষয়ে জামায়াত আমিরের মন্তব্য দাবিতে দুই গণমাধ্যমের নামে সম্পাদিত ও ভুয়া ফটোকার্ড প্রচার 

জুলাই আন্দোলনের সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে গত ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছেন। এরই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে সম্প্রতি মূলধারার গণমাধ্যম আমার দেশ ও কালের কণ্ঠের ফটোকার্ডের ডিজাইনের আদলে তৈরি দুইটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।

আমার দেশের লোগো সংবলিত প্রচারিত ফটোকার্ডের শিরোনাম ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিঃশর্ত মুক্তি চায় জামায়াতের আমীর’।

ফেসবুকে প্রচারিত আমার দেশের লোগো সংবলিত ফটোকার্ড পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত আমার দেশের লোগো সংবলিত ফটোকার্ড পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

কালের কণ্ঠের লোগো সম্বলিত প্রচারিত ফটোকার্ডের শিরোনাম ‘নারী বিবেচনায় শেখ হাসিনার মৃতুদন্ড বাতিল করার অনুরোধ জামাত আমির ডক্টর শফিকুর রহমানের।’

ফেসবুকে প্রচারিত কালের কণ্ঠের লোগো সংবলিত ফটোকার্ড পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত কালের কণ্ঠের লোগো সংবলিত ফটোকার্ড পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, শেখ হাসিনার রায়ের বিষয়ে জামায়াতের আমিরের আলোচিত মন্তব্য দাবিতে এমন কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ আমার দেশ বা কালের কণ্ঠ প্রকাশ করেনি। প্রকৃতপক্ষে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় আমার দেশ ও কালের কণ্ঠের ফটোকার্ড ডিজাইনের আদলে ফটোকার্ড তৈরি করে আলোচিত দাবি প্রচার করা হয়েছে।

আমার দেশের ফটোকার্ড যাচাই

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে আলোচিত ফটোকার্ডে আমার দেশের লোগো ও তারিখ হিসেবে ১৭ নভেম্বর, ২০২৫ উল্লেখ থাকার সূত্রে সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইট এবং ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করলে সাম্প্রতিক সময়ে উক্ত তথ্য সম্বলিত কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইটেও উক্ত দাবির বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তবে, গত ১৭ নভেম্বরে “দেশবাসীকে যে আহ্বান জানালেন জামায়াত আমির” শীর্ষক শিরোনামে একটি ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়। ফটোকার্ডটি পর্যালোচনা করে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডের ছবি ও গ্রাফিক্যাল ডিজাইনের সাথে এর সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। তবে আলোচিত ফটোকার্ডটিতে ‘দেশবাসীকে যে আহ্বান জানালেন জামায়াত আমির’ শীর্ষক বাক্যের পরিবর্তে ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিঃশর্ত মুক্তি চায় জামায়াতের আমীর’ শীর্ষক বাক্য লেখা হয়েছে। এছাড়া, ফন্টের গাঢ়ত্ব, লাইন স্পেসে খানিকটা পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। পাশাপাশি, ‘বিস্তারিত কমেন্টে’ শব্দগুচ্ছেরও অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

অর্থাৎ, আমার দেশ এর এই ফটোকার্ডটি সম্পাদনা করে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে। আমার দেশের উক্ত আসল ফটোকার্ডের মন্তব্য বিভাগে সংযুক্ত লিঙ্কের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘দেশবাসীকে ধৈর্য, সতর্কতা ও ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সোমবার (১৭ নভেম্বর) বিকেলে নিজের ফেসবুক পোষ্টে তিনি এ আহ্বান জানান। ডা. শফিকুর রহমান লেখেন, ‘বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। নানা রাজনৈতিক উত্তাপ, সামাজিক অস্থিরতা ও দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার মাঝে আমাদের জন্য জরুরি হলো—ন্যায়বিচার, সত্য এবং জনগণের অধিকারকে সবচেয়ে উঁচু আসনে প্রতিষ্ঠা করা।..’ প্রতিবেদনে ডা. শফিকুর রহমানের গত ১৭ নভেম্বরে ফেসবুক পোস্টের লেখা প্রচার করা হয় তবে তাতে আলোচিত দাবির কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

কালের কণ্ঠের ফটোকার্ড যাচাই

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে আলোচিত ফটোকার্ডে কালের কণ্ঠের ওয়েবসাইট লিঙ্ক ও তারিখ হিসেবে ১৮ নভেম্বর, ২০২৫ উল্লেখ থাকার সূত্রে সংবাদমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করলে উক্ত তারিখে উক্ত তথ্য সম্বলিত কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইটেও উক্ত দাবির বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ফটোকার্ডটি বিশ্লেষণে সংবাদমাধ্যমটির ফেসবুক পেজের ফটোকার্ডগুলোর সাথে আলোচিত ফটোকার্ডটির গ্রাফিক্যাল ডিজাইন, টেক্সটের ফন্ট, ফন্টের গাঢ়ত্ব, লাইন স্পেসে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। পাশাপাশি, কালের কণ্ঠের ফটোকার্ডের শিরোনামে সাধারণত দাঁড়ির সংযুক্তি থাকে না কিন্তু আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডের শিরোনামে দাঁড়ির সংযুক্তি পাওয়া যায়। এছাড়াও, বানান ভুলও লক্ষ্য করা যায়। যেমন : ‘মৃত্যুদণ্ড’কে ‘মৃতুদন্ড’ লেখা হয়েছে।

পাশাপাশি অন্য গণমাধ্যম এবং বিশ্বস্ত সূত্রগুলোর বরাতেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের উক্ত মন্তব্য সম্বলিত কোনো তথ্য বা সংবাদ পাওয়া যায়নি৷ প্রকৃতপক্ষে শফিকুর রহমান এরূপ কোনো মন্তব্য করে থাকলে তা মূলধারার গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হতো।

সুতরাং, শেখ হাসিনার রায়ের বিষয়ে জামায়াতের আমিরের মন্তব্য দাবিতে প্রচারিত আমার দেশের ফটোকার্ডটি সম্পাদিত ও কালের কণ্ঠের ফটোকার্ডটি ভুয়া।

তথ্যসূত্র

Share: