আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে ভুয়া তথ্য প্রচার

সম্প্রতি, ভোটচুরির নির্বাচন করতে দিবোনা সেনাবাহিনীর হুংকার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে হুমকি- শীর্ষক ক্যাপশনে এবং ভোটচুরির নির্বাচন করতে দিবো না: সেনাবেহিনী- শীর্ষক থাম্বনেইলে একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে।

ফেসবুকে প্রচারিত এমনকিছু পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

ইউটিউবে প্রচারিত ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এমন কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি বরং ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার কয়েকটি ভিডিও এবং ছবি সংযুক্ত করে চটকদার থাম্বনেইল ব্যবহার করে আলোচিত ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানের শুরুতে আলোচিত ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে রিউমর স্ক্যানার টিম। ভিডিওটির শুরুতে ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার কয়েকটি ভিডিওর খণ্ডাংশ এবং ছবি দেখানো হয়। পরবর্তীতে আলোচিত দাবিটি সম্পর্কে পাঁচটি ভিডিও দেখানো হয়। কিন্তু এতে কোথাও জরুরি অবস্থা জারি কিংবা সেনাবাহিনীর ক্ষমতায় আসা বিষয়ক কোনো দৃশ্য কিংবা তথ্য দেওয়া হয়নি।

ভিডিও যাচাই ১

অনুসন্ধানের শুরুতে আলোচিত ভিডিওটিতে থাকা প্রথম ভিডিওটি থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে কানাডা থেকে পরিচালিত Nagorik TV নামক একটি ইউটিউব চ্যানেলে গত ১০ অক্টোবর “জেক সালিভানের সাথে অসফল মিটিং ও অনিশ্চিত রাজনৈতিক গন্তব্য” শীর্ষক শিরোনামে একটি টকশো ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়।

১ ঘন্টা ৪৪ মিনিট ৬ সেকেন্ডের টকশোটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এখানে সেনাবাহিনী নির্বাচন করতে দিবে না শীর্ষক কোনো আলোচনা হয়নি।

এছাড়া, আলোচিত ভিডিওটিতে থাকা অংশটির সাথে উক্ত ভিডিওর ১ ঘন্টা ৩ মিনিটের অংশটির হুবহু মিল রয়েছে।

ভিডিও যাচাই ২

পরবর্তীতে একজন সংবাদ পাঠিকাকে সংবাদ পাঠ করতে শোনা যায়। সেই ভিডিওটিতে থাকা বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসি নিউজের লোগো’র সূত্র ধরে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করে ডিবিসি নিউজের ইউটিউব চ্যানেলে গত ৮ অক্টোবর “এবার ঢাকা অচলের পরিকল্পনা বিএনপির, আসছে কঠোর আন্দোলন” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত মূল ভিডিওটি খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, এটি বিএনপি’র সরকার পতন আন্দোলন সংক্রান্ত কর্মসূচি নিয়ে করা একটি প্রতিবেদন।

ভিডিও যাচাই ৩

আলোচিত ভিডিওটিতে থাকা তৃতীয় ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধানে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করে Voice Bangla নামক একটি ইউটিউব চ্যানেলে গত ১৩ অক্টোবর “বিএনপির বিষয়ে সিইসির এতো কঠিন সত্য বয়ান?” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত মূল ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়।

ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের বিবিসি বাংলায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকার নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।

উক্ত ভিডিওতে সেনাবাহিনীকে নিয়ে কোনো তথ্য উপস্থাপন করেননি তিনি।

ভিডিও যাচাই ৪

আলোচিত ভিডিওটিতে থাকা দৃশ্যটির বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল গাজীপুর মহানগর নামক একটি ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও (আর্কাইভ) খুঁজে পাওয়া যায়।

ভিডিওটির ক্যাপশন থেকে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জ উপজেলার এশিয়ান হাইওয়েতে কেন্দ্র ঘোষিত অবরোধের ১ম দিনের কর্মসূচি পালনকালে নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি সুলতান মাহমুদ, রুপগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব মাসুদুর রহমান, সাবেক যুগ্ম আহবায়ক আরিফ বিল্লাহ ও দাউদপুর ইউনিয়ন ছাত্রদল নেতা তৌহিদ হাসানকে পুলিশ গ্রেফতার করে। সোমবার (৬ নভেম্বর) আটককৃতদের আদালতে হাজির করা হয়।

এছাড়া কি-ওয়ার্ড সার্চ করে বাংলা ট্রিবিউনে গত গত ৬ নভেম্বর “নারায়ণগঞ্জে ছাত্রদলের ৪ নেতা আটক” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

এই প্রতিবেদন থেকেও একই তথ্য জানা যায়।

ভিডিও যাচাই ৫

আলোচিত ভিডিওরিতে সর্বশেষ বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য দেওয়ার একটি ভিডিও ক্লিপ দেখা যায়।

পরবর্তীতে তারেক রহমানের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে গত ৫ নভেম্বর “সারাদেশব্যাপী সর্বাত্মক অবরোধ সফল করায় জনগণকে ধন্যবাদ এবং সীমিত সামর্থের নির্বাচন কমিশনকে পদত্যাগের আহবান” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি লাইভ ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়।

ভিডিওটিতে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিএনপি’র চলমান কর্মসূচির জন্য নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য দেন।

উপরোক্ত পাঁচটি ভিডিও পর্যবেক্ষণ করে এটি স্পষ্ট যে, উক্ত ভিডিওগুলোতে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সেনাবাহিনীর বক্তব্য সম্পর্কিত কোনো তথ্য নেই।

এছাড়া, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে কোনো বক্তব্য দেওয়া হলে বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলে অবশ্যই সে সংবাদ দেশীয় মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হতো। কিন্তু উক্ত দাবিগুলোর বিষয়ে গুগলে কি ওয়ার্ড সার্চ করে কোনোপ্রকার তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আলোচিত দাবি সংক্রান্ত কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

মূলত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো রাজপথে আন্দোলন করে আসছে। এরই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ভোটচুরির নির্বাচন করতে দিব না- সেনাবাহিনী– শীর্ষক শিরোনামে একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে রিউমর স্ক্যানার টিম অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশ সেনবাহিনীর পক্ষ থেকে এসংক্রান্ত কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি বা সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি। উক্ত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি ঘটনার ভিডিও ক্লিপ এবং ছবি ব্যবহার করে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, পূর্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য দেশে সেনাবাহিনীর জরুরি অবস্থা জারি দাবিতে ইন্টারনেটে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রিউমর স্ক্যানার।

সুতরাং, সেনাবাহিনীকে উদ্ধৃত করে আগামীতে ভোট চুরির নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না শীর্ষক দাবিটি মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: