রাজনীতি-ভোট-বৈশ্বিক সংকট: প্রথম প্রান্তিকের অপতথ্য বিশ্লেষণ   

  • তিন মাসে ১৯৭৪ ভুল তথ্য শনাক্ত
  • সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার দল বিএনপি
  • দায়িত্বের প্রথম ৪৩ দিনে সরকারকে জড়িয়ে ১৩২ অপতথ্য
  • সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে ৭০, পুলিশকে জড়িয়ে ৫৮ ভুল তথ্য
  • সার্কাজম, এআই, ডিপফেক ও ভুয়া ফটোকার্ডে অপতথ্য লাগামছাড়া
  • অর্ধশতাধিক অপতথ্যে ভারতীয় সম্পৃক্ততা শনাক্ত

২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশে মোট ১৯৭৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩৬ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে এই সংখ্যা ছিল ৮৩৭টি। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ভুল তথ্যের বিস্তার বাড়ার পেছনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ জাতীয়, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আগের প্রান্তিকের (২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর) তুলনায় এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৩৭ শতাংশ।

একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে। রাজনৈতিক দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য প্রচারিত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে নিয়ে। এই তথ্যগুলো রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে গত তিন মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে।

মূল মঞ্চ ফেসবুক: প্রতিদিন গড়ে ১৯টি ভুল তথ্য

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ফেসবুকেই চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সর্বাধিক ভুল তথ্যের বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। মেটার মালিকানাধীন এই প্ল্যাটফর্মে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মোট ১,৭৩২টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর অর্থ, প্রতিদিন গড়ে ১৯টিরও বেশি ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছে এখানে।

ফেসবুকের পর একক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে টিকটকে (৩৬৮টি)। এছাড়া ইউটিউবে ১১৫টি, ইনস্টাগ্রামে ২৬৪টি এবং মেটার আরেক প্ল্যাটফর্ম থ্রেডসে ৫১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরেও অপতথ্য বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে দেশের গণমাধ্যম। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভিডিওসহ মোট ৬৮টি কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি, ভারতীয় গণমাধ্যমেও অন্তত ৯টি ঘটনায় বাংলাদেশকে জড়িয়ে অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

রাজনৈতিক অপতথ্যের গতিপ্রকৃতির নিয়ামক যখন নির্বাচন

১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজনৈতিক অপতথ্যের গতিপ্রকৃতির সিংহভাগজুড়েই ছিল এই নির্বাচনের প্রভাব। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিক (অক্টোবর–ডিসেম্বর) এবং ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি–মার্চ)–এই দুই সময়ের তথ্য তুলনা করলে রাজনৈতিক অপতথ্যের প্রবাহে একটি ধারাবাহিক উত্থান এবং পরবর্তী সময়ে হঠাৎ পতনের স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে রাজনৈতিক অপতথ্যের সংখ্যা ছিল ২০৫, যা নভেম্বর মাসে বেড়ে ৩০৫ এবং ডিসেম্বর মাসে আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৪৪৬-এ দাঁড়ায়। একই সময়ে নির্বাচন-সংক্রান্ত অপতথ্যও ২৬ থেকে ৮১ হয়ে ডিসেম্বর মাসে ১১০-এ পৌঁছায়। অর্থাৎ, বছর শেষে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী অপতথ্যের একটি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হচ্ছিল।

এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে আরও তীব্র আকার ধারণ করে। জানুয়ারিতে রাজনৈতিক অপতথ্য ৪৬৯ এবং ফেব্রুয়ারিতে তা ৮০৯-এ পৌঁছে সর্বোচ্চ অবস্থানে যায়। নির্বাচন-সংক্রান্ত অপতথ্যও একইভাবে জানুয়ারির ২৭১ থেকে ফেব্রুয়ারিতে ৪৯১-এ উন্নীত হয়, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় বহুগুণ বেশি। ফলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে যে নির্বাচনী অপতথ্যের ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল, তা ২০২৬ সালের শুরুতে চূড়ান্ত বিস্ফোরণে রূপ নেয়।

তবে এই প্রবণতা মার্চে এসে হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ে। রাজনৈতিক অপতথ্য ২৫০-এ নেমে আসে এবং নির্বাচন-সংক্রান্ত অপতথ্য মাত্র ৮-এ সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ, যে তীব্রতা ফেব্রুয়ারিতে দেখা গিয়েছিল, তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রশমিত হয়। এই আকস্মিক পতন ইঙ্গিত করে যে নির্বাচনী কার্যক্রম বা সংশ্লিষ্ট উত্তেজনা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপতথ্যের প্রবাহও দ্রুত হ্রাস পেয়েছে।

সার্বিকভাবে এই দুই প্রান্তিকের তুলনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। রাজনৈতিক অপতথ্য হঠাৎ করে তৈরি হয় না; বরং এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, নির্দিষ্ট সময়পর্বে (বিশেষ করে নির্বাচন ঘিরে) চূড়ায় পৌঁছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত কমে যায়।

এবার নির্বাচনের দিন গণভোটও হয়েছে। এটি নিয়েও অপতথ্যের প্রচার ছিল। তবে নির্বাচনের সাথে তুলনা করলে গণভোট-সংক্রান্ত অপতথ্য খুবই সীমিত প্রভাব ফেলেছে।

খাতভেদে ভুল তথ্যের ভিন্ন চিত্র

তিন মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভুল তথ্যের বিস্তার ক্ষেত্রভেদে ভিন্ন প্রবণতা অনুসরণ করেছে। জাতীয় বিষয়ে অপতথ্য ধারাবাহিকভাবে উচ্চমাত্রায় থাকলেও সময়ের সঙ্গে সামান্য হ্রাস পেয়েছে, যা ইঙ্গিত করে এই খাতটি সবসময়ই ভুল তথ্যের একটি প্রধান উৎস।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভুল তথ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে তৃতীয় মাসে তা হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাতকে ঘিরে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য, পুরোনো ছবি-ভিডিও ও ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ার কারণে এই বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে।

ধর্মীয় ও খেলাধুলা সংশ্লিষ্ট ভুল তথ্য শুরুতে কিছুটা সক্রিয় থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা কমে এসেছে। বিনোদন ও সাহিত্য খাতে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল প্রবণতা দেখা যায়। শিক্ষা খাতে ভুল তথ্য খুবই সীমিত পর্যায়ে ছিল, যা অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় কম গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রতারণা সংশ্লিষ্ট অপতথ্য এই প্রান্তিকের মাঝামাঝি সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলেও পরে কিছুটা কমেছে, তবে এটি এখনও নজরদারির প্রয়োজনীয় একটি ক্ষেত্র হিসেবে রয়ে গেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং জলবায়ু সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে শেষের দিকে কিছু ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।

প্রথম প্রান্তিকে কারা টার্গেটে?

জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ভুল তথ্যের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাজনীতি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা। সম্মিলিতভাবে এবং রাজনৈতিক—উভয় ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (২৮৭) বিপুল ব্যবধানে শীর্ষে, যা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জনমত প্রভাবিত করার প্রবণতাকে তুলে ধরে। তার পরেই রয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা (৯০) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান (৮০), যাদের ঘিরেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপতথ্য ছড়িয়েছে।

জাতীয় ইস্যুতে নজর দিলে দেখা যায়, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস (৫০) সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। পাশাপাশি সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে জড়িয়েও কিছু অপতথ্য ছড়িয়েছে।

নারী সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা এগিয়ে। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান ও ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমাকে নিয়ে বিভ্রান্তি নারী ব্যক্তিত্বদের লক্ষ্য করে তথ্য বিকৃতির প্রবণতাকে ইঙ্গিত করে।

প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে অপতথ্যের উপস্থিতি তুলনামূলক কম হলেও তা তাৎপর্যপূর্ণ। সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী (৭০) ও বাংলাদেশ পুলিশ (৫৮) বেশি টার্গেট হয়েছে—যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা প্রভাবিত করার চেষ্টার ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে ক্রীড়া ও বিনোদন অঙ্গনে ভুল তথ্যের পরিমাণ কম হলেও তা পুরোপুরি অনুপস্থিত নয়। ক্রীড়ায় মুস্তাফিজুর রহমান এবং বিনোদনে আসিফ আকবরকে ঘিরে ভুল তথ্যের প্রবাহ ছিল সবচেয়ে বেশি।

দল হিসেবে বিএনপি, ব্যক্তি হিসেবে তারেক রহমানকে জড়িয়ে সর্বোচ্চ গুজব

জানুয়ারি–মার্চ সময়কালের রিউমর স্ক্যানারের শনাক্ত করা রাজনৈতিক অপতথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভিন্ন ভিন্ন দলের ক্ষেত্রে অপতথ্যের ধরন ও প্রবণতায় স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের শিকার হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটি, দলটির বিভিন্ন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের নামে গত তিন মাসে ৭৯০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যেখানে দল হিসেবে বিএনপিকে ঘিরে ৭৭ শতাংশ এবং দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে ৮৫ শতাংশ অপতথ্য নেতিবাচক প্রকৃতির। একইভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর (৫৫৪) ক্ষেত্রেও উচ্চমাত্রার নেতিবাচক অপতথ্য লক্ষ্য করা যায়। নেতিবাচকতার এই হার দল হিসেবে ৭৮ শতাংশ এবং দলের আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে ৮৪ শতাংশ।

রাজনৈতিক অপতথ্য উপস্থাপনের ধরণ

Infogram

অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ক্ষেত্রে মোট অপতথ্যের পরিমাণ (১৭২) কম হলেও নেতিবাচকতার হার সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে ঘিরে শতভাগ অপতথ্যই নেতিবাচক, যা তাকে সম্পূর্ণভাবে নেতিবাচক প্রচারণার টার্গেটে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

এর বিপরীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। দলটি, দলের বিভিন্ন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের নামে তিন মাসে ৩৩০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু দলটিকে ঘিরে ৮৭.৫ শতাংশ এবং দলের সভাপতি শেখ হাসিনাকে ঘিরে ৮২ শতাংশ অপতথ্য ইতিবাচক প্রকৃতির, যা ইঙ্গিত করে এই দল ও নেতৃত্বকে ঘিরে প্রচারণামূলক বা অনুকূল অপতথ্যের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি।

বিএনপি সরকারের ৪৩ দিন: অপতথ্য শতাধিক

১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ৪৩ দিনেই বিএনপি সরকারের কার্যক্রম ঘিরে মোট ১৩২টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৯% নেতিবাচক উপস্থাপনা—যা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে, সরকারের সূচনালগ্ন থেকেই অপতথ্য সমান্তরালভাবে বিস্তার লাভ করেছে।

সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে অপতথ্যের প্রবাহ আরও বেশি কেন্দ্রীভূত। মাত্র দেড় মাসে তাকে ঘিরে ৬৫টি অপতথ্য পাওয়া গেছে, যার ৬৩% নেতিবাচক।

একই সময়ে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়ে ৪৯টি অপতথ্যের প্রচার দেখা গেছে। এর মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (১১) ও সালাহউদ্দিন আহমেদ (৬) তুলনামূলকভাবে বেশি টার্গেট হয়েছেন। পাশাপাশি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ডা. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, নুরুল হক নুর, ইশরাক হোসেন, শামা ওবায়েদ, জোনায়েদ সাকি এবং ববি হাজ্জাজ-সহ আরও বেশ কয়েকজনের নাম অপতথ্যে এসেছে।

ভুয়া তথ্যের নিয়মিত শিকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

দেশে সশস্ত্র এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জড়িয়ে এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে ১৩৪টি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার৷ এর মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে সর্বোচ্চ ৭০টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। বাহিনীটির বর্তমান প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে নিয়ে ১৫টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।

এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশকে নিয়ে ৫৮টি, র‍‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‍্যাব) নিয়ে ৩টি এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) নিয়ে একটি করে ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার৷

প্রথম প্রান্তিকে অপতথ্যের ইস্যুভিত্তিক চিত্র

২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে অনলাইন অঙ্গনে অপতথ্যের বিস্তার ছিল বহুমাত্রিক ও ইস্যুকেন্দ্রিক। এই সময়ে অন্তত ২২টি আলোচিত ইস্যুতে মোট ৩১২টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এসব ঘটনা বিশ্লেষণে বোঝা যায়, নির্দিষ্ট ঘটনা ঘিরে দ্রুত ও সংগঠিতভাবে ভুল তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা সময়ের সাথে বাড়ছে।

প্রথম প্রান্তিকে দেশীয় ইস্যুগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে ময়মনসিংহে দীপু দাস হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাকে পিটিয়ে হত্যার এই ঘটনাকে ঘিরে ১৮টি ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছে, যা একক ইস্যু হিসেবে সর্বোচ্চ। এছাড়া ওসমান হাদির ওপর হামলা (৯), খালেদা জিয়ার মৃত্যুর ঘটনা (৯), এবং ডা. শফিকুর রহমান-এর এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক দাবিকে ঘিরে (১১) উল্লেখযোগ্য অপতথ্য ছড়িয়েছে।

একইসঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়গুলো, যেমন ইনকিলাব মঞ্চের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ (১২), চলমান জ্বালানি সংকট (১৪), জানুয়ারির গ্যাস সংকট (৬) এবং জকসু নির্বাচন (৮) নিয়েও ধারাবাহিকভাবে অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। এমনকি উৎসব ও জাতীয় দিবস যেমন মাহে রমজান (৮), ঈদুল ফিতর (১১), শহীদ দিবস (৮), স্বাধীনতা দিবস (৫)—এসবকেও অপতথ্যের বাইরে রাখা হয়নি।

এই সময়ে ক্রীড়া ও বিনোদনভিত্তিক ইস্যুতেও কিছু অপতথ্য লক্ষ্য করা গেছে, যেমন মুস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল থেকে বাদ পড়ার ঘটনায় (১২) এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে (৪) কেন্দ্র করে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছড়িয়েছে চলমান ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ঘিরে (১৪৫টি)। এছাড়া এপস্টিন ফাইলস (১৩), ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা (৩) এবং পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত (২) নিয়েও কিছু ভুল তথ্য ছড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে সংবেদনশীল, আলোচিত ও আবেগঘন ইস্যুগুলো। বিশেষ করে সহিংস ঘটনা, রাজনৈতিক উত্তেজনা, সংকট পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক সংঘাত—এসবই অপতথ্যের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

সার্কাজম, এআই ও ডিপফেক: অপতথ্যের তিন বড় উৎস

প্রথম প্রান্তিকে অপতথ্যের ধরন বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অপতথ্য শুধু দাবি বা গুজব নয়, বরং কনটেন্টের প্রকৃতিতেও বড় পরিবর্তন এসছে।

এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে সার্কাজম বা ব্যঙ্গাত্মক পেজের পোস্টকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে প্রচারের প্রবণতা (১৮২টি)। অর্থাৎ, রসাত্মক বা বিদ্রূপাত্মক কনটেন্টকে প্রাসঙ্গিকতা না বুঝেই অনেক ক্ষেত্রে সত্য হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে। এমনকি দায়িত্বশীলদের বক্তব্যে-ওয়াজে এসব কনটেন্টকে সত্য ধরে নিয়ে সমালোচনার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা সম্প্রতি একটি ওয়াজ মাহফিলে জ্বালানী সংকট নিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কথিত একটি মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি ওয়াজে বলেন, “কত মন্ত্রী আজ কথা বলছে, তেল দিতে পারে না একটু সরি বলবে, না? বলছে হেঁটে চলাফেরা করতে পারেন না? শরীর ভালো থাকবে।” অথচ, হাঁটাহাঁটি করার পরামর্শ দিয়ে কোনো মন্তব্যই করেননি মন্ত্রী। দাবিটির সূত্রপাত একটি সার্কাজম পেজ থেকে। 

এর পাশাপাশি গেল তিন মাসে এআই-নির্ভর কনটেন্ট অপতথ্য প্রচারের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে উঠে এসেছে (২৯৪টি)। ছবি, ভিডিও বা টেক্সট, সব ক্ষেত্রেই কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্ট ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্য অপতথ্য তৈরি করা হচ্ছে, যা শনাক্ত করা দিনকে দিন তুলনামূলক কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এআই এর ফাঁদে নিয়মিতই পড়তে দেখা যাচ্ছে গণমাধ্যমকেও। মার্চে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও মূল শ্যুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী ভারতে গ্রেপ্তারের খবরে তাদের হাতকড়া পরা একটি ছবি দেশের অন্তত দুই ডজনের বেশি মূল ধারার গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়, যা মূলত গুগলের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদনা করা হয়েছিল।

এআই এর আরেকটি ধরন ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্টও লক্ষ্য করা গেছে প্রথম প্রান্তিকে। যদিও সংখ্যায় (৩১টি) কম, তবে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি, কারণ এসব কনটেন্ট সাধারণত বাস্তব ব্যক্তির চেহারা বা কণ্ঠ নকল করে তৈরি করা হয়।

অপতথ্যের উৎসে ভারতীয় সংযোগ

ভারতীয় গণমাধ্যম ও ভারত-ভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে ভুয়া তথ্য প্রচারের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকেও একই চিত্র উঠে এসেছে রিউমর স্ক্যানারের পর্যবেক্ষণে।

জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে বাংলাদেশ-সম্পর্কিত নয়টি পৃথক ঘটনায় ভারতের মোট ৫১টি সংবাদমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, তিনটি অপতথ্য প্রচারের কারণে তালিকার শীর্ষে রয়েছে আজতক বাংলা।

এছাড়া অন্তত ২২টি ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে ভুয়া তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের বিষয়টিও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে।

২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে রিউমর স্ক্যানার মোট ৪৩টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করে। এর মধ্যে ৩৩টি ঘটনায়, অর্থাৎ প্রায় ৭৭ শতাংশ ক্ষেত্রে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে অপতথ্য ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।

সব মিলিয়ে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে অন্তত ৬৪টি অপতথ্য প্রচারে ভারতীয় উৎসের সম্পৃক্ততা শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।

ভুয়া ফটোকার্ডে অপতথ্যের বিস্তার

বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ানো এখন একটি কৌশলগত পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে গণমাধ্যমের নাম ও লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এই সময়ে এমন ৫৯৩টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে মোট ৬১১টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি টার্গেট হয়েছে দেশীয় গণমাধ্যম। মোট ৫৯টি আক্রান্ত সংবাদমাধ্যমের মধ্যে ৫৪টিই দেশের, আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ছিল মাত্র ৫টি।

আক্রান্ত গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে দৈনিক আমার দেশ (৯১)। এরপর রয়েছে যমুনা টিভি (৬৫) ও দৈনিক কালের কণ্ঠ (৫৫)। এছাড়া আরটিভি (৩২) এবং চ্যানেল২৪-কেও (৩১) উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

কাজের পদ্ধতি

এই পরিসংখ্যানটি রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর উপর ভিত্তি করে প্রকাশ করা হয়েছে। পরিসংখ্যান প্রকাশের নিমিত্তে নিয়মিত গত তিন মাসের প্রতিটি প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এরপর তথ্য-উপাত্তগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব তথ্য-উপাত্ত তুলনা করা হয়েছে গত বছরের শেষ প্রান্তিকের তথ্য-উপাত্তের সাথে। পরবর্তীতে সেগুলোকে ইনফোগ্রাফিক এবং লেখার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।

Share: