রিউমর স্ক্যানার ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভুল সংবাদের পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। এ সময় ১৭৭টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ৬৮১টি প্রতিবেদন যাচাই করে ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বাধিক ভুল তথ্য প্রকাশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে দৈনিক ইনকিলাব, যেখানে ২১টি ভুল তথ্যসম্বলিত প্রতিবেদন শনাক্ত হয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে, যার ৮৭ শতাংশই ইতিবাচক বয়ানের। অন্যদিকে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে বিএনপিকে নিয়ে, যার ৫০ শতাংশই ইতিবাচক প্রকৃতির।
এক নজরে পরিসংখ্যান

- ১৭৭টি গণমাধ্যমের অবস্থান দেখুন এখানে।
মার্চ-জুনে ভুল তথ্য বেশি
গণমাধ্যমে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১৪৬টি ঘটনায় ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৪টি ঘটনার ভুল তথ্য (২৩ শতাংশ করে) শনাক্ত হয়েছে মার্চ ও জুন মাসে। এপ্রিলে শনাক্ত ২৭টি (১৮ শতাংশ)। সবচেয়ে কম ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে জানুয়ারিতে, ১৫টি।
মাস ভিত্তিক ভুল সংবাদের পরিমাণ
Infogram
কোন ক্যাটাগরিতে বেশি ভুল?
গণমাধ্যমগুলোর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রচারিত ভুল সংবাদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভুল তথ্যের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিষয়ক প্রতিবেদন সবচেয়ে বেশি, যার সংখ্যা ৫৪। এরপর রয়েছে রাজনৈতিক বিষয়ে ৪১টি এবং জাতীয় বিষয়ে ২৯টি ভুল তথ্যসম্বলিত প্রতিবেদন। এছাড়া খেলাধুলা বিষয়ে ১০টি, ধর্মীয়, বিনোদন ও শিক্ষা বিষয়ে ৩টি করে, স্বাস্থ্য বিষয়ে ২টি এবং পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে ১টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
ক্যাটাগরি ভিত্তিক ভুল সংবাদের পরিমাণ
Infogram
কোন খবরে বেশি ভুল?
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ১৪৬টি ঘটনায় পাওয়া ভুল তথ্যগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের একটি ঘটনায় সবচেয়ে বেশি গণমাধ্যম ভুল তথ্য প্রচার করেছে। অন্তত ৬৭টি মূল ধারার গণমাধ্যমে এই ঘটনায় নিহত এক নারীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে দাবি করে, আদতে তিনি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী হিসেবে এইচএসসি পাস করেন, তবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হননি।
ক্রমিকফ্যাক্টচেকভুল তথ্য প্রদানকৃত গণমাধ্যম সংখ্যা ০১রায়পুর হত্যাকান্ডে নিহত সায়মা ঢাবি শিক্ষার্থী নন৬৭০২হামের কারণে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সব ছুটি বাতিলের পুরোনো অফিস আদেশ সাম্প্রতিক দাবিতে গণমাধ্যমে প্রচার৩৬০৩বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর ইস্যুতে গণমাধ্যমে ভুল ছবি ও তথ্য৩৬০৪“হিন্দুরা মুসলিমদের ওপর অত্যাচার করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না” শীর্ষক মন্তব্য করেননি থালাপতি বিজয়৩০০৫মন্ত্রীসভায় শপথের জন্য ডাক পাননি ড. মঈন খান২৯০৬বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের জন্য সব ভিসা নয়, শুধু অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়াকরণ স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র২৯
এই তালিকায় থাকা শীর্ষ ছয়টি ঘটনার তিনটি জাতীয় ইস্যু এবং একটি করে রাজনৈতিক, স্বাস্থ্য ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের ঘটনা। তালিকায় ১০টি বেশি গণমাধ্যম ভুল তথ্য প্রচার করেছে এমন ঘটনা পাওয়া গেছে ১৩টি।
কোন ইস্যুতে বেশি ভুল?
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুনে আলোচিত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অন্তত ৪৭টি আলোচিত ইস্যুতে মোট ১৪৬৭টি ভুল তথ্য শনাক্ত করে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে ২৪টি ইস্যুতে গণমাধ্যমেও ভুল তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ইস্যুর মধ্যে গণমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের ঘটনাগুলোয়। এই সংঘাতের ঘটনাপ্রবাহে শনাক্ত হওয়া ১৮০টি ভুল তথ্যের মধ্যে ২২টিতে গণমাধ্যমও ভুল তথ্য প্রচার করেছে। আন্তর্জাতিক এই ইস্যুর বাইরে দেশীয় বিভিন্ন ঘটনাবলীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য (৯টি) শনাক্ত হয়েছে ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইস্যুতে।

ভুল তথ্যের লক্ষ্যবস্তু রাজনৈতিক দল-ব্যক্তিত্ব
গণমাধ্যমে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিত্বকে জড়িয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভুল তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে (অঙ্গসংগঠন ও নেতাকর্মীসহ) নিয়ে সর্বোচ্চ ২২টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার ৫০ শতাংশ ইতিবাচক বয়ানের। একই সময়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগকে নিয়ে ৮টি (৮৭ শতাংশ ইতিবাচক), জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে ৫টি (৬০ শতাংশ ইতিবাচক) এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) নিয়ে ৩টি (৬৭ শতাংশ ইতিবাচক) ভুল তথ্য প্রচার করেছে গণমাধ্যম।
গেল ছয় মাসে রাজনৈতিক এবং জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনায় ছিলেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে, যার সংখ্যা ৮টি এবং এর ৮৭ শতাংশ ইতিবাচক বয়ানের। এছাড়া শামীম ওসমানকে নিয়ে ৩টি (সবগুলোই ইতিবাচক), ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে ২টি (সবগুলোই নেতিবাচক), হাসনাত আবদুল্লাহকে নিয়ে ২টি (উভয়ই ইতিবাচক), ফজলুর রহমানকে নিয়ে ২টি (উভয়ই নেতিবাচক), জুবাইদা রহমানকে নিয়ে ২টি এবং জাইমা রহমানকে নিয়ে ২টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে—যার সবগুলোই ইতিবাচক বয়ানের
ইনকিলাব যেভাবে প্রথম
গণমাধ্যমের ভুল সংবাদের এই পরিসংখ্যানের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে দেশের অন্যতম জাতীয় দৈনিক ইনকিলাব। সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোয় প্রকাশিত সংবাদগুলো বিশ্লেষণ করে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ২১টি ভুল সংবাদ প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার৷ এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯টি ভুল সংবাদ প্রচার হয়েছে আন্তর্জাতিক বিষয়ে, শতকরা হিসেবে যা প্রায় ৪৩ শতাংশ। এছাড়া, জাতীয় ইস্যুতে ৭টি, রাজনৈতিক ইস্যুতে ৪টি এবং ধর্মীয় ইস্যুতে ১টি ভুল তথ্য প্রচার করেছে পত্রিকাটি।
সংবাদগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইনকিলাব ৫টি সংবাদ হিসেবে পুরোনো ভিডিওকে সাম্প্রতিক দাবিতে প্রচার করেছে। এছাড়া, সাজানো বা স্ক্রিপ্টেড ভিডিওকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে ৩টি সংবাদে। একইভাবে এআই কনটেন্টকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়েছে ৬টি সংবাদে। পত্রিকাটি গেল ছয় মাসে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচার করেছে অন্তত দুইটি ভিডিওর মাধ্যমে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও ভুল তথ্যের প্রচার
রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন গণমাধ্যমেও ভুল তথ্য প্রচারের নজির পাওয়া গেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি), বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)—প্রতিটি গণমাধ্যমে একটি করে ভুল তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন শনাক্ত হয়েছে।
বিদেশি গণমাধ্যমও বাদ যায়নি
শুধু দেশীয় নয়, বিদেশি গণমাধ্যমের বাংলা সংস্করণেও ভুল তথ্য প্রকাশের ঘটনা পাওয়া গেছে। রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিবিসি বাংলা ও ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগে একটি করে ভুল তথ্যসম্বলিত প্রতিবেদন শনাক্ত হয়েছে।
এআই-পুরোনো ভিডিও জায়গা নিচ্ছে গণমাধ্যমে
গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভুল তথ্যের উৎস বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরোনো ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচারের প্রবণতাই সবচেয়ে বেশি, যার সংখ্যা ৩২। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি কনটেন্টের কারণে ২৭টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। ভুয়া মন্তব্যভিত্তিক ৯টি, স্ক্রিপ্টেড বা সাজানো ঘটনার ৭টি, ভুয়া পেজ বা প্রোফাইল থেকে নেওয়া তথ্যের ৫টি এবং সার্কাজম পেজের কনটেন্টকে সত্য হিসেবে প্রকাশের ৪টি ঘটনা পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে পুরোনো ছবি ও সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের ৪টি করে, ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহারের ২টি এবং পুরোনো বক্তব্যকে সাম্প্রতিক দাবি করে প্রচারের ২টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। পরিসংখ্যানটি দেখায়, যাচাই ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টকে সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করাই ভুল তথ্য প্রচারের অন্যতম প্রধান কারণ।
গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রয়োজনে +8801751589458 এই হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে মেসেজ দিয়ে ভুল সংবাদগুলোর তালিকা সংগ্রহ করতে পারবেন।


