সুনামগঞ্জে চুরির অভিযোগে হামলার ভিডিওকে সাম্প্রদায়িক আঙ্গিকে অপপ্রচার

সম্প্রতি একটি বাড়িতে হামলার একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়েছে, ‘সুনামগঞ্জের একটি হিন্দু পরিবারের ওপর জিহাদি/ইসলামপন্থীরা হামলা করেছে। গ্রামবাসীরা চেয়েছিল তারা মুসলিম হোক। যখন তারা রাজি হয়নি, তখন তাদের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ তোলা হয় এবং এরপর একদল লোক তাদের বাড়িতে পাথর ও বাঁশের লাঠি দিয়ে আক্রমণ চালায়।’ (অনূদিত)

এরূপ দাবিতে ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

এরূপ দাবিতে এক্সে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

এরূপ দাবিতে লিংকডইনে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রচারিত ভিডিওটি ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত না হওয়ায় হিন্দু পরিবারের ওপর হামলার দৃশ্যের নয়। প্রকৃতপক্ষে, ভিডিওটি গত ২৫ মার্চে সুনামগঞ্জে চুরির অভিযোগে আলী হোসেন ও তারেক মিয়ার বাড়িতে হামলার দৃশ্যের। ভিডিওতে প্রদর্শিত নারীও হিন্দু নন বরং, মুসলিম।

আলোচিত ভিডিওর বিষয়ে অনুসন্ধানে ‘নিউজ১০’ নামক একটি সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজে গত ২৫ মার্চে ‘চু’রির অভিযোগ ঘিরে সুনামগঞ্জে বাড়ি ভা’ঙ’চুর ও লু’টপা’টে’ ক্যাপশনে প্রচারিত একটি ভিডিও পোস্ট পাওয়া যায়। ভিডিওটির সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত দৃশ্যের মিল পাওয়া যায়।

এছাড়াও, অনুসন্ধানে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘বাংলানিউজ২৪’ এর ওয়েবসাইটে ‘সুনামগঞ্জে গরু চুরির অভিযোগে ঘর ভাঙচুর’ শিরোনামে গত ২৫ মার্চে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে সংযুক্ত কোলাজ ছবির একটি দৃশ্যের সাথেও আলোচিত দাবিতে প্রচারিত দৃশ্যের মিল পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে ‘বাংলানিউজ২৪’ এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলায় গরু চুরির অভিযোগে এক ব্যক্তির ঘর ভাঙচুর করেছে গ্রামবাসী। বুধবার (২৫ মার্চ) দুপুরে উপজেলার দোলারবাজার ইউনিয়নের দক্ষিণ কুর্শি গ্রামের আব্দুল খালিকের ছেলে আলী হোসেনের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আলী হোসেনসহ ৭-৮ জন নিয়মিত চুরি করে এলাকার মানুষজনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছেন। এতে এলাকার ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।.. (২৫ মার্চ) দুপুর ১২টার দিকে আলী হোসেনের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় আলী হোসেনের মেয়ে গরু চোরখ্যাত তারেকের স্ত্রী তার পিত্রালয় রক্ষার জন্য দা হাতে তেড়ে গ্রামবাসীর দিকে তেড়ে যান। তার কোলে একটি শিশু সন্তান ছিল। এক পর্যায়ে গ্রামবাসী ভাঙচুর ও লুটপাট করে ঘরটি।’

এরই সূত্র ধরে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলে আলোচিত দৃশ্যের সংযুক্তিসহ সুনামগঞ্জ ভিত্তিক স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘সুনামগঞ্জের খবর’ এর ওয়েবসাইটেও এ বিষয়ে গত ২৫ মার্চে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। উক্ত প্রতিবেদনেও চুরি সংক্রান্ত একইরকম তথ্য জানা যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সম্প্রতি দোলারবাজার ইউনিয়নের উত্তর কুর্শি গ্রামে মো. দুলন মিয়ার বাড়িতে গরুসহ এক ব্যক্তিকে হাতেনাতে আটক করা হয়। এর জের ধরে বুধবার (২৫ মার্চ) দুপুরে বিক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত আব্দুল হকের ছেলে তারেক মিয়া ও আব্দুল খালিকের ছেলে আলী হোসেনের বাড়িতে হামলা চালায়। হামলার সময় বসতঘর ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, তারেক মিয়ার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে বাড়ি রক্ষার চেষ্টা করছেন। উত্তেজিত জনতা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে তিনি ও তার শিশু সন্তান আহত হন। এছাড়া বাড়ির বিভিন্ন মালামাল ভাঙচুর ও কিছু সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।’

এছাড়াও, এ বিষয়ে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো’র ওয়েবসাইটেও গত ২৫ মার্চে প্রতিবেদন প্রকাশ হতে দেখা যায়। প্রতিবেদনে হামলার পেছনের প্রেক্ষাপট বিষয়ে বলা হয়, ‘..মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) রাতে উত্তর কুরশি গ্রামের দোলন মিয়ার বাড়িতে গরু চুরির সময়ে আটক করা হয় পাশের মইনপুর গ্রামের সাইফুল ইসলামকে (২৫)। এ সময় তাঁদের সঙ্গে থাকা আরও তিনজন পালিয়ে যান। আজ (২৫ মার্চ) সকালে এ নিয়ে মোহাম্মদগঞ্জ বাজারে বৈঠকে বসেন এলাকাবাসী। বৈঠকে আটক সাইফুল স্বীকারোক্তি দেন তাঁর সঙ্গে মইনপুর গ্রামের আবু হানিফা, দক্ষিণ কুরশির আলী হোসেন ও তারেক মিয়া ছিলেন। বৈঠকে সবার মতামতের ভিত্তিতেই উত্তেজিত লোকজন দক্ষিণ কুরশির আলী হোসেন ও তারেক মিয়ার বাড়িতে গিয়ে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর চালান। দুটি ঘর একেবারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে হামলা থেকে ঘরবাড়ি রক্ষার চেষ্টা করা নারী তারেক মিয়ার স্ত্রী।..’

অর্থাৎ, উপরোক্ত তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, হামলার ঘটনার প্রেক্ষাপটে কোনো হিন্দু ধর্মাবলম্বীর ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার কোনো বিষয় ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, এটি চুরি সংক্রান্ত ঘটনার জেরে সংঘটিত হয়েছে। তাছাড়া, হামলার শিকার হওয়া পরিবার বা নারীও হিন্দু নন বরং, মুসলিম।

সুতরাং, সুনামগঞ্জে চুরির অভিযোগে মুসলিম পরিবারের ওপর হামলার ঘটনার দৃশ্যকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত না হওয়ায় হিন্দু পরিবারের ওপর হামলার ভিডিও দাবিতে প্রচার করা হয়েছে; যা মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: