নির্বাচন ঘিরে ভুয়া জরিপের ছড়াছড়ি: অপতথ্যে বিভাজনের শঙ্কা দেখছেন শিক্ষার্থীরা

গত বছরের অন্তত জুলাই থেকে অক্টোবরের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আল-জাজিরা’র বরাত দিয়ে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা যাচাই সংক্রান্ত একটি কথিত গোপন জরিপের তথ্য ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার হচ্ছিল। প্রচারিত পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়, এই গোপন জরিপে ৭ কোটি মানুষ অংশগ্রহণ করেন। তথ্যানুযায়ী আওয়ামী লীগের পক্ষে ৫২ শতাংশ, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ২০ শতাংশ, বিএনপির পক্ষে ১৪ শতাংশ, এনসিপির পক্ষে ৫ শতাংশ, ইসলামি আন্দোলনের পক্ষে ৩ শতাংশ এবং জাতীয় পার্টির পক্ষে ২ শতাংশ সমর্থনের ফলাফল পাওয়া গেছে জরিপটিতে। রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখে, আল-জাজিরা এমন কোনো জরিপ পরিচালনা করেনি। সংবাদমাধ্যমটির নাম ব্যবহার করে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে দাবিটি প্রচার করা হয়েছে।
কোনো দেশে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, ততই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে নানা ধরনের জরিপ ও জনমত সমীক্ষা। কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে—এমন শিরোনামে প্রকাশিত এসব তথাকথিত জরিপ অনেক সময় ভোটারদের মনোভাব প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু বাস্তবে এর একটি বড় অংশই ভুয়া, বিভ্রান্তিকর কিংবা যাচাইযোগ্য তথ্য ছাড়াই তৈরি। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন ভুয়া জরিপ নিয়ে করা একাধিক ফ্যাক্টচেকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরিকল্পিতভাবে এসব অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা নির্বাচনী পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
ভুয়া জরিপের তালিকা
Infogram
গণমাধ্যম থেকে জাতিসংঘ: জরিপকারী হিসেবে নানা নাম
২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন কেন্দ্রিক ভুয়া জরিপ সংক্রান্ত ১৮টি ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করেছে রিউমর স্ক্যানার। এসব ফ্যাক্টচেকের ১২টিই প্রকাশিত হয়েছে গত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ভুয়া জনসমর্থন দেখানোর অসুস্থ এক প্রতিযোগিতাই যেন হয়ে উঠেছে এসব ভুয়া জরিপ।
রিউমর স্ক্যানার পর্যালোচনা করে দেখেছে, ভুয়া এসব জরিপের জরিপকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নাম। এই তালিকায় আছে আল-জাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স, ভয়েস অফ আমেরিকার নাম৷ দেশি গণমাধ্যম হিসেবে জড়ানো হয়েছে জাতীয় দৈনিক আমার দেশের নামও। এছাড়া, দুইটি ভুয়া জরিপে জড়ানো হয়েছে জাতিসংঘকে৷ ভুয়া এসব জরিপে এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটসের (ইএএসডি) মতো অস্তিত্ব আছে এমন সংস্থাকে যেমন জড়ানো হয়েছে তেমনি ‘ইন্টারন্যাশনাল ইলেকশনস সার্ভে সেন্টার’ নামে অস্তিত্বহীন সংস্থার নাম চালিয়ে দেওয়া হয়েছে জরিপকারী হিসেবে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, বাংলাদেশ পুলিশ নির্বাচনে কোন দল কয়টি আসন পাবে তা নিয়ে একটি জরিপ করেছে বলে ভুয়া দাবি ছড়িয়েছে পুলিশ সদস্যের এ সংক্রান্ত বক্তব্যের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভিডিও দিয়ে।

গণমাধ্যমের ফটোকার্ড-সার্কাজম পেজ অপপ্রচারের অস্ত্র
নির্বাচন সামনে রেখে ছড়ানো ভুয়া জরিপে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে—বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যমের লোগো ও ডিজাইন ব্যবহার করে তৈরি করা ভুয়া ফটোকার্ড। রিউমর স্ক্যানারের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এসব অপতথ্যে আরটিভির ৩টি এবং এনটিভি, যমুনা টিভি, আমার দেশ ও একাত্তর টিভির একটি করে ভুয়া ফটোকার্ড বানিয়ে ছড়ানো হয়েছে।

এসব ফটোকার্ডে জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হলেও সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম কখনোই এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। ফ্যাক্টচেকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি এসব ভিজ্যুয়াল অপতথ্য ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা নির্বাচনী স্বচ্ছতার জন্য গুরুতর হুমকি।
নির্বাচন সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া জরিপের অন্যতম উৎস হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে বিভিন্ন সার্কাজম বা ব্যঙ্গাত্মক পেজ। ‘মজা’ বা ‘ব্যঙ্গাত্মক’ ভঙ্গিতে প্রকাশিত এসব পোস্টে মনগড়া জরিপের ফল উপস্থাপন করা হলেও, সেগুলোর সঙ্গে কোনো বাস্তব জরিপ বা নির্ভরযোগ্য তথ্যের মিল নেই। যেমন, গত বছরের ০৮ ডিসেম্বর জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো প্রকাশিত এক জরিপ থেকে জানা যায়, নির্বাচনে আ.লীগকে চান না ২৮%, শর্তহীন ও শর্তযুক্তভাবে চান ৬৯%। এই জরিপের ফল প্রকাশের পরদিনই Gorom TV নামের একটি ফেসবুক পেজে একটি ফটোকার্ডের সন্ধান মেলে, যার শিরোনাম দেওয়া হয়, “আওয়ামী লীগ ছাড়া ভোট কেন্দ্রে যাবে না ৬৫ শতাংশ মানুষ: জরিপ!”
তবে পোস্টে এ বিষয়ে কোনো সূত্র বা প্রমাণ উল্লেখ পাওয়া যায়নি৷ একটি স্যাটায়ার পেজের ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে সূত্রপাত হওয়া এই পোস্টকে আসল খবর দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। এমন এক পোস্টে প্রায় দশ হাজারের কাছাকাছি রিয়েক্ট পড়েছে, দেড় হাজার মানুষের কমেন্ট এসেছে তাতে। ‘গরম টিভি’ নামের পেজটি মূলত বিনোদনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কনটেন্ট বানিয়ে প্রচার করে।

ফ্যাক্টচেকের তথ্য বলছে, এই সার্কাজম পেজগুলোর পোস্ট এভাবেই পরবর্তীতে ব্যঙ্গাত্মক প্রেক্ষাপট ছাড়াই সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো সত্য জনমত জরিপ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে ব্যঙ্গ করার আড়ালেই তৈরি হচ্ছে নির্বাচনী অপতথ্য ছড়ানোর একটি কার্যকর পথ।
নির্বাচনে নেই আ.লীগ, তবু ভুয়া জরিপে দলটির প্রতি অকুণ্ঠ জনসমর্থন
রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক করা ভুয়া জরিপগুলোর ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এগুলোর বড় অংশই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে ফলাফল দেখিয়েছে। মোট শনাক্ত হওয়া ভুয়া জরিপের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল আওয়ামী লীগকে ‘এগিয়ে’ দেখানো হয়েছে সবচেয়ে বেশি—৬টি ক্ষেত্রে। এর পরেই রয়েছে জামায়াতে ইসলামী (৪টি) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (২টি)। তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক ভুয়া জরিপে বিএনপিকে ‘এগিয়ে’ দেখানো হয়েছে (মাত্র ১টি)।

ফ্যাক্টচেক করা ভুয়া জরিপগুলোর আরেকটি অংশে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে বিপক্ষে দেখানোর প্রবণতা স্পষ্ট। রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বিএনপিকে—৬টি ভুয়া জরিপে। এর পরেই রয়েছে এনসিপি (৫টি) এবং ইসলামী আন্দোলন (৩টি)। জাতীয় পার্টিকে নেতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে ২টি ক্ষেত্রে। তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক ভুয়া জরিপে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীকে বিপক্ষে দেখানো হয়েছে—প্রতিটি মাত্র ১টি করে।
ফ্যাক্টচেক করা ভুয়া জরিপে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নাম এসেছে সবচেয়ে বেশি—২টি ভুয়া জরিপে। জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে পক্ষে দেখানো হয়েছে ১টি ক্ষেত্রে। অন্যদিকে নেতিবাচক উপস্থাপনের তালিকায় একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বিপক্ষে দেখানো হয়েছে সবচেয়ে বেশি—২টি ভুয়া জরিপে। এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের—প্রত্যেককে নেতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে ১টি করে ভুয়া জরিপে। এই বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয়, ভুয়া জরিপগুলো শুধু দল নয়, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও লক্ষ্য করে ইতিবাচক ও নেতিবাচক বয়ান তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
রিউমর স্ক্যানারের জরিপে শিক্ষার্থীদের ভোটদানে আগ্রহের ইঙ্গিত
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অঞ্চলভিত্তিক অপতথ্যের প্রবাহ সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা পেতে রিউমর স্ক্যানার দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত পরিসরে একটি জরিপ পরিচালনা করেছে। গত বছরের ৪ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সময়কালে দেশের ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত মোট ৯৭ জন শিক্ষার্থীর ওপর এই জরিপ চালানো হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৬১ জন পুরুষ ও ৩৬ জন নারী শিক্ষার্থী ছিলেন।

জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৯ শতাংশের বেশি আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে ৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজেদের সংসদীয় আসনে নির্বাচনের পরিবেশকে ‘ভালো’ বলে মূল্যায়ন করেছেন। তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অপতথ্যের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও স্পষ্ট। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, নির্বাচনী অপতথ্য ভোটার ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে পারে এবং সহিংসতা উস্কে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
অপতথ্য আগামী নির্বাচনের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—এমন প্রশ্নে ৪৪ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে এর প্রভাব হবে ‘অনেক বেশি’। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নির্বাচনসংক্রান্ত ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের পরিমাণ বেড়েছে বলেও মত দিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ এসেছে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বক্তব্য বিকৃত করে প্রচারের বিষয়ে—যা চিহ্নিত করেছেন ৬৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। এছাড়া গণমাধ্যমের ভুয়া ফটোকার্ড, এআই-নির্মিত ভিডিও এবং পুরোনো ভিডিও নতুন করে প্রচারের প্রবণতার কথাও উঠে এসেছে—যেগুলোর পক্ষে মত দিয়েছেন যথাক্রমে ৫৩, ৫২ ও ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় অপতথ্য ছড়ানো একটি কৌশল হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। এ কারণে অপতথ্য ছড়ানোর দায় রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাকর্মীদের ওপর বর্তায় বলে মত দিয়েছেন প্রায় ৯৪ শতাংশ শিক্ষার্থী।
এআই ও ডিপফেক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতনতার বিষয়টিও জরিপে উঠে এসেছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৭২ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা এআই ও ডিপফেক—দুটো বিষয়েই অবগত। বিপরীতে, ৪ শতাংশের কিছু বেশি শিক্ষার্থী জানিয়েছেন যে তারা এ দুইয়ের কোনোটির সম্পর্কেই জানেন না। একই সঙ্গে ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, এআই দিয়ে তৈরি সব ধরনের নির্বাচনী প্রচারণামূলক কনটেন্টে বাধ্যতামূলকভাবে ‘এআই-সৃষ্ট’ (AI-generated) লেবেল যুক্ত করা উচিত। তবে নির্বাচনী অপতথ্য মোকাবেলায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষও স্পষ্ট—প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে তারা সন্তুষ্ট নন।

