শিশুকে টেপ দিয়ে আটকে রাখার এই ছবিটি এপস্টিন ফাইলসের সাথে সম্পর্কিত নয়

আলোচিত এপস্টিন ফাইলসে টেপের সহায়তায় শিশুর হাত আটকে রাখার ছবির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ছবি প্রচারিত হতে দেখে রিউমর স্ক্যানার। ছবিটিতে দেখা যায়, টেপ দিয়ে একটি মেয়ে শিশুর হাত টেবিলের সাথে আটকে রাখা হয়েছে। 

ফেসবুকে প্রচারিত এমন পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত একই পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচিত ছবিটির সাথে জেফরি এপস্টিনের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এছাড়াও এপস্টিন ফাইলসে ছবিটির সন্ধান পাওয়ার দাবিটিও সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, ছবিটি জেমস আলেফ্যান্টিস নামের একজন পিজ্জাশপ মালিকের ধর্মকন্যার। মজার ছলে তোলা এই ছবিটি নিয়ে পূর্বেও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমানে এটিকে এপস্টিন ফাইলের সাথে জড়িয়ে আবার প্রচার করা হয়েছে।

আলোচিত দাবিটি যাচাই করতে অনুসন্ধান চালিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে এপস্টিন ফাইলসে এমন কোনো ছবির অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরবর্তীতে ছবিটির বিষয়ে অনুসন্ধানে মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজে ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর ‘Pizzeria owner targeted by fake news stories speaks out’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকার প্রতিবেদনের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, ওয়াশিংটন ডিসির Comet Ping Pong নামক একটি পিজ্জা রেস্টুরেন্টের মালিক জেমস আলেফ্যান্টিস ২০১৪ সালের ৪ জুন ছবিটি তার ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পোস্ট করেছিলেন। এরপর প্রায় দেড় বছর পর Wikileaks হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনী দলের John Podesta এর ব্যক্তিগত ইমেইল প্রকাশ করে। প্রকাশিত ইমেইলগুলো সাধারণ সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ, ডিনারের আমন্ত্রণ, বন্ধুদের সঙ্গে কথোপকথন, নির্বাচনী পরিকল্পনা ইত্যাদির ছিল। তবে ইমেইলগুলোতে “pizza” “cheese” ইত্যাদি শব্দের বেশ কয়েকবার উল্লেখ পাওয়া যায়। মূলত, পিজ্জা শব্দটি পেডোফাইল বা বাল্যকামীতার সাথে সম্পর্কিত দাবি করে এগুলোকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে প্রচার করা হয়। পাশাপাশি ইমেইলে Comet Ping Pong নামের একটি পিজ্জাশপ ও এর মালিক জেমস আলেফ্যান্টিসের নামও পাওয়া যায়।

এরপর অনলাইনে অনেকটা এমন গল্প ছড়িয়ে পড়ে যে: যেহেতু ইমেইলে pizza শব্দ আছে, যেহেতু Alefantis একটি পিজ্জা দোকানের মালিক, তাই নিশ্চয়ই ওই দোকানে গোপন কিছু চলছে। আরো দাবি করা হলো, রেস্টুরেন্টের বেসমেন্টে শিশুদের আটকে রাখা হয় এবং গোপন চক্র পরিচালনা করা হয়।

আর এর প্রমাণ হিসেবে তারা রেস্টুরেন্ট মালিক Alefantis এর ইন্সটাগ্রাম থেকে টেপড শিশুর ওই ছবিটি (+আরো কিছু ছবি) ‘প্রমাণ’ হিসেবে দেখাতে শুরু করে। এভাবেই ছবিটিকে ২০১৬ সালে ওই রেস্টুরেন্টের শিশু নির্যাতন, গোপন শিশু পাচার চক্র ও বিকৃত মানসিকতার ‘প্রমাণ’ হিসেবে দেখাতে ছবিটি হাজির করা হয়।

শিশুদের আটকে রেখে নির্যাতনের এই গুজব বিশ্বাস করে ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে এক ব্যক্তি বন্দুক নিয়ে ওই রেস্টুরেন্টে হাজির হয়েছিলেন এবং গুলিও চালিয়েছিলেন, তবে কেউ আহত হয়নি। এরপর পুলিশ রেস্টুরেন্টটিতে অনুসন্ধান চালিয়ে নিশ্চিত করেন Pizzagate ইস্যুটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন গুজব ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে নিশ্চিত করে। ওই রেস্টুরেন্টে কোনো বেসমেন্টও পাওয়া যায়নি।

ফক্স নিউজের এই ভিডিওটিতে আলোচিত ওই রেস্টেুরেন্ট মালিককেও এ বিষয়ে কথা বলতে দেখা যায়। তিনি জানান, ছবিতে দেখতে পাওয়া ওই শিশুটি তার গডডটার বা ধর্মকন্যা। সে তার বোনের সাথে খেলার সময় তার বোন টেপ দিয়ে তার হাত টেবিলের সাথে আটকে দিয়েছিল। শিশুদের বাবা-মাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ওই মুহুর্তে তোলা এই ছবি পরবর্তীতে তিনি তাদের অনুমতি নিয়েই ইন্সটাগ্রামে প্রচার করেন। যা নিয়ে পরে মিথ্যাচার শুরু হয়।

অর্থাৎ, আলোচিত শিশুর ছবিটির সাথে এপস্টিন ফাইলসের কোনো সম্পর্ক নেই। এছাড়াও ছবিটি শিশু নির্যাতনের কোনো ঘটনাও নয়।

সুতরাং, এপস্টিন ফাইলসে টেপের সহায়তায় শিশুর হাত আটকে রাখার সন্ধান পাওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: