তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন হবে বলে সেনাপ্রধান কোনো মন্তব্য করেননি 

সম্প্রতি ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিয়েই জাতীয় নির্বাচন জানালেন সেনাপ্রধান’ শীর্ষক শিরোনাম ও ‘টকশোতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে মুখ খুললেন সেনাপ্রধান’ শীর্ষক থাম্বনেইল ব্যবহার করে একটি ভিডিও ইউটিউবে প্রচার করা হচ্ছে।

ইউটিউবে প্রচারিত উক্ত ভিডিওটি দেখুন এখানে(আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান কোনো মন্তব্য করেননি বরং ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার কয়েকটি ছবি ও ভিডিও সংযুক্ত করে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় একটি ভিডিও তৈরি করে কোনোপ্রকার তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই উক্ত দাবিটি প্রচার করা হচ্ছে।

গত ৮ এপ্রিল Sabai Sikhi(আর্কাইভ) নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে ১ মিনিট ১০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়।

অনুসন্ধানের শুরুতে ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে রিউমর স্ক্যানার টিম। এতে দেখা যায়, এটি ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি ঘটনার ছবি ও ভিডিও ক্লিপ নিয়ে তৈরি একটি নিউজ ভিডিও। সেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান উর্ধতন কর্মকর্তাকে দেখা যায়।

১ মিনিট ১০ সেকেন্ডের এই নিউজ ভিডিওটিতে বলা হয়, ‘এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুমোদন দিলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধিনে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান এই সেনাপ্রধান কর্মকর্তা। আগামী ৩ মাসের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার অঙ্গীকার করেন এই সেনাপ্রধান কর্মকর্তা। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত। নির্বাচনের দায়িত্ব দেওয়া হলে তা যথাযথভাবে পালন করা হবে বলেন জানান এই কর্মকর্তা। এছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল দল যেন অংশগ্রহণ করে সেজন্য তত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প নেই কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারই একমাত্র সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারবে।’

উক্ত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে প্রাসঙ্গিক একাধিক কি ওয়ার্ড সার্চ করেও উক্ত দাবিগুলোর কোনো সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার কয়েকটি আলাদা ছবি এবং ভিডিও যুক্ত করে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্যসূত্র ছাড়াই দাবিগুলো প্রচার করা হচ্ছে।

পাশাপাশি ভিডিওটির কি ফ্রেম কেটে কয়েকটি স্থিরচিত্র নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখা যায় ভিডিওটির শুরুর ১৬ সেকেন্ড ২০১৮ সালে প্রচারিত ডিবিসি নিউজের রাজকাহন টকশো(আর্কাইভ) থেকে নেওয়া হয়েছে। ডিবিসি নিউজের ইউটিউব চ্যানেলে ‘সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত’ শিরোনামে ২০১৮ সালের ২১ নভেম্বর প্রচারিত ৩৭ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডের টকশোটি ৩৫ মিনিট ১৫ সেকেন্ড অংশ থেকে ৩৫ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড অংশ পর্যন্ত দাবিকৃত প্রতিবেদনে নেওয়া হয়েছে।

উক্ত টকশোতে অংশগ্রহণকালীন বর্তমান সেনা প্রধান এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মেজর জেনারেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেসময় তিনি ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে এসডিএস’র দায়িত্ব ছিলেন।

এছাড়াও ভিডিওটি থেকে নেওয়া কিছু স্থিরচিত্র রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে দেখা যায় সেগুলো অনেক পুরোনো প্রতিবেদন থেকে নেওয়া ছবি। ভিডিওটির ৪৬ সেকেন্ডের সময় প্রদর্শিত একটি ছবিতে সেনাবাহিনীর এক উর্ধতন কর্মকর্তাকে মিডিয়ার সামনে কথা বলতে দেখা যায়। তবে রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, উক্ত ছবিটি বৈশাখী টিভি’র অনলাইন সংস্করণে গত ৩১ জানুয়ারি ‘আধুনিক সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হবে: সেনাপ্রধান’ শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন(আর্কাইভ) থেকে নেওয়া হয়েছে।

এছাড়াও ভিডিওটি’র ৫০ সেকেন্ডের সময় প্রদর্শিত একটি ছবিতে কয়েকজন সেনা সদস্যকে দেখা যায়। তবে রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে উক্ত ছবিটি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা(বাসস) এর অনলাইন সংস্করণে ২০২২ সালের ০৭ মে ‘সেনাবাহিনীর প্রধানের কক্সবাজার খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শন’ শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন(আর্কাইভ) থেকে নেওয়া হয়েছে।

এছাড়াও ভিডিওটির ১ মিনিট ১০ সেকেন্ডের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩ সদস্যকে রাস্তায় টহল দিতে দেখা যায়। তবে রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, উক্ত ছবিটি বিবিসি নিউজের অনলাইন সংস্করণে ২০১৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর ‘নির্বাচনী কাজে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী’ শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন(আর্কাইভ) থেকে নেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার কয়েকটি ছবি এবং ভিডিও সংযুক্ত করে আলোচিত ভিডিওটি ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি করা হয়েছে।

এছাড়াও মূল ধারার গণমাধ্যম কিংবা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিশিয়াল ওয়েবসাইট, নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট কিংবা অন্যকোনো সূত্রে সেনাপ্রধানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কোনো মন্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মূলত, সম্প্রতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন হওয়া নিয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ এর মন্তব্য দাবিতে একটি ভিডিও ইউটিউবে প্রচার করা হয়েছে। তবে রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, উক্ত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন হবে উল্লেখ করে সেনাপ্রধান কোনো মন্তব্য করেননি।

উল্লেখ্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নাম জড়িয়ে ভুয়া তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসব ঘটনা নিয়ে পূর্বেও একাধিক ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রিউমর স্ক্যানার। এমন কিছু প্রতিবেদন দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে

সুতরাং, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন হবে বলে সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ মন্তব্য করেছেন দাবিতে প্রচারিত তথ্যটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: