ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্প ঘিরে ছড়াল চারটি ভুয়া ভিডিও, সঙ্গে পুরোনো গল্প 

গত ২৫ জুন ভেনেজুয়েলায় পরপর ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে, বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রচারিত অন্তত চারটি ভিডিও ও একটি তথ্যকে গত ২৫ জুন হওয়া ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পের ভিডিও বা তথ্য দাবিতে প্রচার করতে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার।

সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ল ভেনিজুয়েলার 7.5 মাত্রার ভূমিকম্পের তীব্রতা- দাবিতে জাগরণ নিউজ এবং কালবেলা একটি ভিডিও পোস্ট করেছে।

একই ভিডিও যুক্ত করে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ)।

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে মূহুর্তেই ল’ণ্ডভ’ণ্ড ভবন- দাবিতে বাংলাদেশের একাধিক গণমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও দেখুন ইত্তেফাক, ডেইলি স্টার, এটিএন বাংলা

একই ভিডিও যুক্ত করে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন: এখানে (আর্কাইভ)।

খাবার টেবিলে বসে থাকা অবস্থায় ভূমিকম্প হওয়ার দৃশ্য- দাবিতে বাংলাদেশের একাধিক গণমাধ্যমে প্রচারিত পোস্ট দেখুন- ইত্তেফাক, রূপালী বাংলাদেশ

একই ভিডিও যুক্ত করে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন: এখানে (আর্কাইভ)।

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে ভবন ভেঙে পড়ার দৃশ্য দাবিতে প্রচারিত ভিডিও দেখুন- বাংলাদেশ টাইমস

একই ভিডিও যুক্ত করে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন: এখানে (আর্কাইভ)।

‘আমাকে টেনে তুলবেন না, আমার মেয়েরা আমার হাত ধরে আছে’ শীর্ষক মন্তব্যটি সাম্প্রতিক সময়ের ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে ধ্বংসাত্মকের নিচে থাকা এক বাবার দাবিতে প্রচার করতে দেখা যায় স্টার নিউজের হেড অব আউটপুট ফারাবী হাফিজকে।

এছাড়া, ফেসবুকে প্রচারিত আরও পোস্ট দেখুন- এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পের ভিডিও দাবিতে প্রচারিত চারটি ভিডিওর কোনোটিই গত ২৫ জুন ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পের নয় এবং মাটিচাপা পড়া অবস্থায় এক বাবার বক্তব্যের ঘটনাটিও সাম্প্রতিক সময়ের নয়। প্রকৃতপক্ষে, প্রচারিত ভিডিও চারটি ভিন্ন ভিন্ন দেশের পুরোনো ঘটনার এবং মাটিচাপা পড়া অবস্থায় বাবার বক্তব্যের ঘটনাটি ১৯৯৯ সালের বন্যায় ভূমিধসের ঘটনার উপর নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের দৃশ্য।

ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পকে কেন্দ্র করে যে চারটি ভিডিও ও একটি তথ্য ছড়িয়েছে সেগুলো আলাদা আলাদাভাবে যাচাই করেছে রিউমর স্ক্যানার।

ভিডিও যাচাই ১

আলোচিত ভিডিওটি গত ২৫ জুন ভেনেজুয়েলায় হওয়া ভূমিকম্পের সময়কার দাবিতে একাধিক গণমাধ্যম প্রচার করেছে।

তবে, অনুসন্ধানে তুরস্কের গণমাধ্যম টিআরটি হাবের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে গত বছরের ১৫ মে প্রচারিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। উক্ত ভিডিওর সাথে আলোচিত ভিডিওর মিল রয়েছে।

টিআরটি হাবের ক্যাপশনে লিখেছে, “মিয়ানমারে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার মুহূর্তের নতুন ফুটেজ সামনে এসেছে”।

উক্ত সূত্র ধরে অনুসন্ধানে তুরস্কের টেলিভিশন tvbengutuk এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে একই তারিখে উক্ত ভিডিওটি প্রচার করতে দেখা যায়। ভিডিওটি ২৮ মার্চের তা স্পষ্ট দেখা যায়।

আরও অনুসন্ধানে রয়টার্সের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছরের ২৮ মার্চ মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলে ৭.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার কেন্দ্রস্থল ছিল দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের কাছাকাছি।

অর্থাৎ, ভিডিওটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়।

ভিডিও যাচাই ২

বিল্ডিং ভেড়ে পড়ার আলোচিত ভিডিওটি গত ২৫ জুনের ভেনেজুয়েলার দাবিতে বাংলাদেশের একাধিক গণমাধ্যম প্রচার করেছে।

তবে, অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্টের ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৩ সালের ০৬ ফেব্রুয়ারি প্রচারিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। উক্ত ভিডিওর সাথে আলোচিত ভিডিওর মিল রয়েছে।

নিউইয়র্ক পোস্টের ক্যাপশন থেকে জানা যায়, প্রচারিত ভিডিওটি তুরস্কে ৭.৮ মাত্রা ভূমিকম্পের সময়কার।

উক্ত সূত্র ধরে অনুসন্ধানে আল জাজিরার ওয়েবসাইটে ২০২৩ সালের ০৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের ০৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক ও সিরিয়াতে শক্তিশালী ৭.৮ ও ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।

অর্থাৎ, ভিডিওটি ২০২৩ সালের।

ভিডিও যাচাই ৩

প্রচারিত ভিডিওটিও ভেনেজুয়েলার দাবিতে একাধিক গণমাধ্যম প্রচার করেছে।

তবে, অনুসন্ধানে চীনের গণমাধ্যম South China Morning Post এর ওয়েবসাইটে গত ১৯ জুন “Filipino family says ‘sorry, grandma’ after woman left inside shaking quake-hit home” শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। উক্ত প্রতিবেদনে থাকা ছবির সাথে আলোচিত ভিডিওর দৃশ্যের মিল রয়েছে।

উক্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ০৮ জুন ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলের দ্বীপ মিন্দানাওতে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। সেই ঘটনার ভিডিও এটি।

একই তথ্যে সংবাদ প্রকাশ করেছে এমএসএনও

ভিডিও যাচাই– ৪

বিল্ডিং ভেঙে পড়ার এই ভিডিওটিও ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পের দাবিতে প্রচার হতে দেখা যায়।

তবে, অনুসন্ধানে তুরস্কের গণমাধ্যম Akdeniz Yayın Grubu এর ওয়েবসাইটে ২০২৩ সালের ০১ অক্টোবর “Hasarlı binanın yıkım sırasında çöktüğü anlar kamerada” শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। উক্ত প্রতিবেদনে থাকা ছবির সাথে আলোচিত ভিডিওর দৃশ্যের মিল রয়েছে।

উক্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের ০৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্কে হওয়া ভূমিকম্পে কাহরামানমারাশের একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে সেটি ভেঙে ফেলার দৃশ্য এটি।

একই তথ্যে সংবাদ প্রকাশ করেছে তুরস্কের আরেকটি গণমাধ্যম EN SON HABERও।

এছাড়া, ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে ধ্বংসাত্মকের নিচে থাকা এক বাবা ‘আমাকে টেনে তুলবেন না, আমার মেয়েরা আমার হাত ধরে আছে’ শীর্ষক মন্তব্যটি দাবিতে একটি ছবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

তবে, অনুসন্ধানে ব্রাজিলের গণমাধ্যম Portal C7 এর ওয়েবসাইটে “Não me puxe para fora… Minhas filhas estão segurando minhas mãos” শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। । উক্ত প্রতিবেদনে থাকা ছবির সাথে আলোচিত ছবির মিল রয়েছে। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর মাসে অবিরাম বৃষ্টির ফলে ভেনিজুয়েলার ভার্গাস রাজ্য এক ধ্বংসলীলায় পরিণত করেছিল। বন্যা ও ভূমিধসে গোটা শহর চাপা পড়েছিল, ঘরবাড়ি ভেসে গিয়েছিল এবং হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। সেই বিশৃঙ্খলা, কাদা আর হতাশার মাঝেও একটি গল্প টিকে আছে। দুই মেয়ের সাথে চাপা পড়া এক বাবা, উদ্ধার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও, তাদের হাত ছাড়তে রাজি হননি।

উক্ত সূত্র ধরে অনুসন্ধানে মেক্সিকান গণমাধ্যম TV Azteca Bajio এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনেও একই তথ্য পাওয়া যায়।

আরও অনুসন্ধানে ব্রাজিলের ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা Aos Fatos এর ওয়েবসাইটে উক্ত ছবিটি নিয়ে প্রকাশিত একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেখান থেকে জানা যায়, প্রচারিত ছবিটি বাস্তব নয় বরং, এটি ১৯৯৯ ডিসেম্বর মাসে ভেনেজুয়েলার বন্যা ও ভূমিধস নিয়ে ২০০৭ সালে নির্মিত হয় ‘Sofía y Daniela’ নামক একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। উক্ত চলচ্চিত্রের দৃশ্য এটি।

অর্থাৎ, উক্ত ছবির সাথে সাম্প্রতিক সময়ে হওয়া ভূমিকম্পের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

সুতরাং, ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার ছবি ও ভিডিওকে সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলা হওয়া ভূমিকম্পে দৃশ্য দাবিতে প্রচার করা হয়েছে; যা মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: