জাজিরায় ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণ করে হত্যার বর্ণনার ভিডিও দাবিতে ভিন্ন ঘটনার পুরোনো ভিডিও প্রচার

সম্প্রতি অনলাইনে এক শিশুর কান্নার ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়েছে, ‘জাজিরায় দিনে-দুপুরে ছোট ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণ করে হত্যা করলো বিএনপির সন্ত্রাসিরা ,থানায় সামনে মার লাশ নিয়ে এসে বর্ণনা দিচ্ছে ছোট্ট শিশু’। নানা পোস্টে ‘বিএনপি’র নাম উল্লেখ না করে ‘এবার জাজিরায় দিনে-দুপুরে ছোট ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণ করে হত্যা করলো দুর্বৃত্তরা। থানায় সামনে মার লাশ নিয়ে এসে বর্ণনা দিচ্ছে ছোট্ট শিশু’ দাবিতেও আলোচিত ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।
এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
এরূপ দাবিতে ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
এরূপ দাবিতে ইউটিউবে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
একই ভিডিও উক্ত নারী ও শিশু হিন্দু দাবিতে এক্সে প্রচার করা হয়েছে দেখুন এখানে (আর্কাইভ)। একই দাবি ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এর নেতা এবং ত্রিপুরা ও মেঘালয় রাজ্যের সাবেক গভর্নর তথাগত রায়কে এক্সে শেয়ার করে বাংলাদেশি হিন্দুদের বিশ্বের সবচেয়ে অসহায় মানুষ দাবি করতে দেখা যায়। দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিডিওর সাথে প্রচারিত দাবির কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকৃতপক্ষে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মাদারীপুরের কালকিনি থানায় পারিবারিক বিরোধের অভিযোগ জানাতে আসা নারী থানায় অসুস্থ হলে তার শিশু কান্নায় ভেঙে পড়ে। এটি সেই ঘটনার ভিডিও। এছাড়াও, প্রচারিত ভিডিওতে প্রদর্শিত শিশু ও নারী হিন্দু নন বরং, মুসলিম ধর্মাবলম্বী।
আলোচিত ভিডিওর বিষয়ে অনুসন্ধানে ‘কালকিনি মডেল প্রেসক্লাব’ এর সাধারণ সম্পাদক ও সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া ‘আশরাফুর রহমান’ নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর প্রচারিত এক ভিডিও পোস্ট পাওয়া যায়। ভিডিওতে প্রদর্শিত দৃশ্যের সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওর মিল পাওয়া যায়। এ বিষয়ে পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, ‘কালকিনি উপজেলার এনায়েতনগর ইউনিয়নের দড়িচর লক্ষীপুর গ্রামের আপন (শিপন, রিপন ও স্বপন) চাচাদের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য একটি গরীব অসহায় পরিবারের বড় ছেলের আর্তনাদ’।

এছাড়াও, মাদারীপুর ভিত্তিক স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘মাদারীপুর সমাচার’ এর ফেসবুক পেজে ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর প্রচারিত আরেকটি ভিডিও পোস্ট পাওয়া যায়। প্রচারিত উক্ত ভিডিওর প্রথমাংশে উক্ত শিশুকে এক নারীর পাশে কাঁদতে দেখা যায় এবং ভিডিওর শেষাংশে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত দৃশ্যের অনুরূপ দৃশ্যের সংযুক্তি পাওয়া যায়। এ বিষয়ে ‘মাদারীপুর সমাচার’ এর ফেসবুক পোস্টটির ক্যাপশনে বলা হয়, ‘মাদারীপুর কালকিনি এনায়েতনগর ইউনিয়নের দড়িচর লক্ষীপুর গ্রামের আপন চাচা (শিপন, রিপন ও স্বপন) এদের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য একটি অসহায় মা থানায় এসে জ্ঞান হারায়,এসময় পরিবারের বড় ছেলের আর্তনাদ করে সাংবাদিকদের যা জানালেন’।
অনুসন্ধানে ‘সংবাদ মাদারীপুর’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বরে প্রচারিত এক ভিডিওতে উক্ত শিশুর পাশে এক নারীকে বলতে শোনা যায় তার পারিবারিক সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে এবং বিচার পেয়েছেন, আর কোনো অভিযোগ নেই। একইকথা উক্ত শিশুকেও বলতে শোনা যায়। এসমসয় শিশুটি তার নাম রবিউল বলে উল্লেখ করে। একইদিনে ‘সংবাদ মাদারীপুর’ এর ফেসবুক পেজে প্রচারিত আরেকটি ভিডিওতে উক্ত শিশুকে বলতে শোনা যায়, তার নাম রবিউল, তার বাবার নাম স্বপন হাওলাদার ও মায়ের নাম সুমি বেগম। এছাড়াও, ভিডিওতে শিশুকে তাদের পারিবারিক সমস্যার কথা উল্লেখ করতেও শোনা যায়। অর্থাৎ, নাম থেকে স্পষ্ট যে তারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী নয়।
পরবর্তী অনুসন্ধানে ‘বাংলাদেশ পুলিশ’ এর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে এ বিষয়ে গত ১ জুনে প্রচারিত একটি পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টে আসল ঘটনার বিষয়ে বলা হয়, ‘..ভিডিওটি সম্পর্কে পুলিশের অনুসন্ধানে জানা যায়, আনুমানিক এক বছরেরও অধিক সময় পূর্বে জায়গা-জমি সংক্রান্তে দেবর ভাসুরদের সাথে পারিবারিক বিরোধের জেরে এক নারী তার শিশু পুত্রকে সাথে নিয়ে মাদারীপুরের কালকিনী থানায় এসেছিলেন। ওই নারীর অভিযোগ অনুযায়ী, তার দেবর বা ভাসুরদের সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদের ঘটনা ঘটে। থানায় আসার পর ওই নারী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন ও তার সাথে থাকা শিশু পুত্র ঘাবড়ে গিয়ে কান্না করেন। ওই সময় থানা প্রাঙ্গণে উপস্থিত স্থানীয় এক সাংবাদিক মোবাইল ফোনে শিশুটির কান্নার দৃশ্য ধারণ করেন এবং একটি অনলাইন মিডিয়ায় ভিডিওটি আপলোড করেন। তৎকালীন কালকিনী থানার অফিসার ইনচার্জ জনাব সোহেল রানা ওই নারীর বিরোধ স্থানীয়ভাবে আপোস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করায় থানায় কোনো এফআইআর দায়ের করার প্রয়োজন হয়নি। উক্ত আপলোডকৃত ভিডিওটিকে পরবর্তীতে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।..’
সুতরাং, শরীয়তপুরের জাজিরায় ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণ করে হত্যার বর্ণনার দৃশ্য দাবিতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মাদারীপুরের কালকিনি থানায় পারিবারিক বিরোধের অভিযোগ জানাতে আসা নারী থানায় অসুস্থ হলে তার শিশুর কান্নার ঘটনার ভিডিও প্রচার করা হয়েছে; যা মিথ্যা।
তথ্যসূত্র
- Ashrafur Rana – Facebook Post
- মাদারীপুর সমাচার – Facebook Post
- সংবাদ মাদারীপুর – Facebook Post
- সংবাদ মাদারীপুর – Facebook Post
- Bangladesh Police – Facebook Post

